মেঘের রাজ্যখ্যাত সাজেকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই সশস্ত্র সংগঠনের বিরোধের জেরে অস্থিরতা বাড়ছে। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, অবরোধ ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে। পর্যটননির্ভর কটেজ, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
২০০৮ সালের দিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে সাজেক। পরে সড়ক যোগাযোগ ও পর্যটনসুবিধা সম্প্রসারিত হওয়ায় এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়। বর্তমানে সাজেকে ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক কটেজ রয়েছে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই তিন মাসকে সাজেকের প্রধান পর্যটন মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পর্যটন খাতের একাধিক উদ্যোক্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে কটেজ ব্যবসায় প্রায় ৩০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। পর্যটকদের খাবারের পেছনে প্রতিদিন ব্যয় হয় আনুমানিক ২২ থেকে ২৫ লাখ টাকা। পাশাপাশি চান্দের গাড়িতে যাতায়াত ও ঘোরাঘুরিতে পর্যটকদের ব্যয় হয় প্রায় ৩০ কোটি টাকা। স্থানীয় পণ্য বিক্রির দোকানসহ অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এ খাত থেকে উল্লেখযোগ্য আয় করে।
তবে সাম্প্রতিক অস্থিরতায় পর্যটকদের যাতায়াত ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে ব্যবসা পরিচালনা, বুকিং এবং আয় নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সংবাদকর্মী, বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাজেকের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সন্তু গ্রুপের মধ্যে বিরোধের অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাত থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কয়েক মাস আগে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের সশস্ত্র কমান্ডার তরুণ চাকমা প্রায় ৫০ জনের একটি দল নিয়ে পিসিজেএসএসের সন্তু গ্রুপে যোগ দেওয়ার পর সাজেকে প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বেড়ে যায়। এরপর পিসিজেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা কয়েকটি অভিযান চালিয়ে এলাকার উল্লেখযোগ্য অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
এদিকে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে ইউপিডিএফের কর্মী-সমর্থকেরা সাজেকের উজোবাজার এলাকায় কর্মসূচি শুরু করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ সময় সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনও মাঠে নামে। সংগঠনগুলো ১১ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ পালন করে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখার পর ২২ অক্টোবর আবার আন্দোলন শুরু হয়।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ২২ অক্টোবর সকালে পর্যটকেরা সাজেক ছেড়ে যাওয়ার সময় তাঁদের বাধা দেওয়া হয় এবং গুলির ঘটনা ঘটে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীও পাল্টা গুলি ছোড়ে বলে দাবি করা হয়েছে। এ সময় অবরোধকারীদের ইটপাটকেলের আঘাতে নিরাপত্তা বাহিনীর নয় সদস্য আহত হন বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে। এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিবরণ পাওয়া জরুরি।
অন্যদিকে, অবরোধকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় ২৪ অক্টোবর থেকে সড়ক ও নৌপথে অর্ধদিবস অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদ নামে ইউপিডিএফের আরেকটি ছায়া সংগঠন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে দুই জেলার যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পিসিজেএসএসের রাঙামাটি জেলা সভাপতি ডা. গঙ্গা মানিক চাকমা এসব ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সংগঠনের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ইউপিডিএফই সংগঠন দুটিকে অবরোধের কর্মসূচি নিতে বাধ্য করেছে।
অন্যদিকে, ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে নেওয়া কর্মসূচিতে তাঁদের সমর্থন থাকবে। ২২ অক্টোবরের ঘটনায় কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবিনিময় হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
বাঘাইছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল মাবুদ বলেন, সাজেক দীর্ঘদিন ইউপিডিএফের প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে পরিচিত থাকলেও কয়েক মাস ধরে পিসিজেএসএসের প্রভাব বেড়েছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। তাঁর মতে, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের প্রভাব পড়ছে পর্যটন খাতে। এভাবে অস্থিরতা চলতে থাকলে সাজেকের পর্যটন ব্যবসা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
রাঙামাটি পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব বলেন, সাজেকে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর প্রয়োজনীয় অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, দ্রুত সাজেকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে এনে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কারণ, পর্যটন খাতের সঙ্গে শুধু কটেজ বা রেস্তোরাঁর মালিকরাই নন, স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বহু পরিবারের জীবিকা জড়িত। অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
এসএ