সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন ঐতিহাসিক নবরত্ন মন্দির। কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে থাকা এই মন্দির বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিল্পরুচির এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। সময়ের বিবর্তনে মন্দিরের মূল কাঠামো ও অলংকরণের অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অম্লান।
পাবনা-বগুড়া মহাসড়কের উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল এলাকা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পূর্বে মন্দিরটির অবস্থান। স্থানীয়ভাবে এটি নবরত্ন মন্দির নামে পরিচিত। মন্দিরের আশপাশে রয়েছে আরও কয়েকটি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা, যা এলাকাটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মন্দিরটির নির্মাণকাল নিয়ে ঐতিহাসিক বিবরণে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলে রামনাথ ভাদুড়ী নামের এক ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেন। তবে মন্দিরটির নির্মাণের সুনির্দিষ্ট সাল ও নির্মাতার পরিচয় নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথি যাচাই প্রয়োজন।
স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, মন্দিরটি তিনতলাবিশিষ্ট এবং উঁচু বেদির ওপর নির্মিত। এর প্রথম ও দ্বিতীয় তলার ছাদের চার কোণে চারটি করে মোট আটটি চূড়া এবং সর্বোচ্চ তলায় ছিল একটি চূড়া। মোট নয়টি চূড়া থাকার কারণেই স্থাপনাটির নাম হয়েছে নবরত্ন মন্দির। দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতিতে সাতটি চূড়া বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে পূর্ব ও পশ্চিম দিকে দুটি চূড়া টিকে রয়েছে।
মন্দিরের দেয়াল, খিলান ও বিভিন্ন অংশে ছিল পোড়ামাটির নান্দনিক অলংকরণ। ফুল, লতাপাতা ও বিচিত্র নকশায় সজ্জিত এসব অলংকরণ প্রাচীন বাংলার শিল্পীদের সৃজনশীলতা ও নির্মাণদক্ষতার পরিচয় বহন করে। সময়ের প্রভাবে অনেক অলংকরণ নষ্ট হয়ে গেলেও স্থাপনার অবশিষ্ট অংশে এখনো প্রাচীন শিল্পরীতির ছাপ দেখা যায়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিবরণেও মন্দিরটির স্থাপত্যশৈলী ও অলংকরণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তবে নির্মাণকাল সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য থাকায় এর সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণে আরও যাচাই প্রয়োজন।
ঐতিহাসিক এই স্থাপনা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে। স্থানীয়দের মতে, মন্দিরের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি স্থাপনাটির আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং দর্শনার্থীদের জন্য তথ্যসমৃদ্ধ পরিচিতিফলক স্থাপন করা প্রয়োজন।
যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে হাটিকুমরুলের নবরত্ন মন্দির সিরাজগঞ্জের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে দেশজুড়ে পরিচিত করে তুলতে পারে। কালের বিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত এই প্রাচীন স্থাপত্যের প্রতিটি ইট ও অলংকরণ যেন অতীতের গল্প বলে- যে গল্প বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
-টিএস/আল-আমিন