একদিকে শীতলক্ষ্যা, অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র। দুই নদীর মিলনস্থলের মাঝখানে সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ চর। বর্ষায় চারপাশে পানি, শীতকালে জেগে ওঠে ফসলের মাঠ। নৌকায় নদী পেরিয়ে এমন প্রাকৃতিক পরিবেশের দেখা মেলে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রানীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ধাঁধার চর।
স্থানীয়দের কাছে ‘মাঝের চর’ বা ‘মাইঝ্যার চর’ নামে পরিচিত ধাঁধার চরটি কাপাসিয়া উপজেলা প্রশাসনের পর্যটন স্পটের তালিকায় রয়েছে। প্রায় ৩ বর্গকিলোমিটার বা ২৫০ একর আয়তনের এ চরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ কিলোমিটার এবং প্রস্থ কমবেশি আধা কিলোমিটার। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে নদীর পলি ও বালু জমে চরটির সৃষ্টি হয়েছে। দূর থেকে এর আকৃতি অনেকটা নৌকার মতো দেখায়।
ধাঁধার চরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর স্বাভাবিক পরিবেশ। চরের কোথাও ফসলের মাঠ, কোথাও গাছপালা ও ফলের বাগান। পেয়ারা, আম, কাঁঠাল ও কলাবাগানের পাশাপাশি বিভিন্ন কৃষিপণ্যের চাষ হয়। ফলে একই জায়গায় নদী, চর, কৃষিজমি ও গ্রামীণ জীবনের বৈচিত্র্য দেখা যায়।
ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় চরের দৃশ্যও। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে চারপাশের জলরাশির মধ্যে সবুজ চরটি আলাদা রূপ নেয়। শীতকালে পানি কমে গেলে দৃশ্যমান হয় বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। ছুটির দিনে বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকায় করে মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ জায়গাটিকে ‘এক টুকরো সেন্ট মার্টিন’ বলেও অভিহিত করেন।
তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। বসার জায়গা, শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। নিরাপদ নৌযান চলাচল এবং যোগাযোগব্যবস্থারও উন্নয়ন প্রয়োজন। ফলে আগ্রহ থাকলেও অনেকের জন্য সেখানে যাতায়াত ও সময় কাটানো সহজ নয়।
গাজীপুর রোটারি ক্লাবের সদস্য মো. মাহাবুব আলম বলেন, ধাঁধার চরের পর্যটন সম্ভাবনা বিবেচনায় সেখানে একটি গেস্ট হাউস নির্মাণ করা যেতে পারে। পর্যটকদের থাকা ও সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হলে আরও বেশি মানুষ এখানে আসতে আগ্রহী হবেন।
তারাগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যাপক সামসুল হুদা লিটন বলেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থলের ধাঁধার চর আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। চারদিকে নদীবেষ্টিত এ চরের প্রাকৃতিক পরিবেশ দর্শনার্থীদের ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
কাপাসিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আজিজুর রহমান পেরা বলেন, ধাঁধার চরকে পরিকল্পিত ও নান্দনিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে কাপাসিয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের জন্যও জায়গাটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
গাজীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহ রিয়াজুল হান্নান রিয়াজ বলেন, ধাঁধার চরকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে এর আগেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নতুন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও বাড়বে।
কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন, ধাঁধার চরকে ঘিরে উপজেলা প্রশাসনের বড় ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত, যোগাযোগব্যবস্থা, নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তবে পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে চরের স্বাভাবিক পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নদীর প্রবাহ, কৃষিজমি, গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য বিবেচনায় রেখে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে পরিকল্পনা করা গেলে পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর সুফল পৌঁছাতে পারে।
শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থলে গড়ে ওঠা ধাঁধার চর এখনো মূলত প্রকৃতিনির্ভর একটি গন্তব্য। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে গাজীপুরের পর্যটন মানচিত্রে নতুন একটি গন্তব্য হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে এই চর।
এসএস