তিন দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের পঞ্চম দিনেও স্বাভাবিক হয়নি রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকের পরিস্থিতি। টানা পাঁচ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে পর্যটনকেন্দ্রটি। সাজেক সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও জরুরি ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন পর্যটন ও পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরা।
চলমান অচলাবস্থা নিরসনে প্রশাসনের উদ্যোগে বাঘাইছড়িতে মতবিনিময় সভা আয়োজনের কথা রয়েছে। এতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সংসদ সদস্য, দুই জেলার জেলা প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং স্থানীয় হেডম্যান ও কারবারিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন গত ১১ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে প্রথম দফায় সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করে। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দাবিগুলো পূরণের আশ্বাস দেওয়া হলে কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন হয়নি অভিযোগ তুলে সংগঠন দুটি ১৫ অক্টোবর আবারও অবরোধ শুরু করে। পরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়।
দুর্গাপূজার বিরতি শেষে দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগে ২২ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে নতুন করে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়। এরপর থেকে সাজেক সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধের পঞ্চম দিন চলছে।
অবরোধকারী সংগঠনগুলোর দাবি, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তারা এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ, সাধারণ মানুষের প্রতি হুমকি ও ভয়ভীতি বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশি বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
সংগঠন দুটির অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যরা সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। তবে জেএসএস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ করে বলা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
ফলে স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
অবরোধের কারণে সাজেক সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে খাদ্যপণ্য ও জরুরি ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও চিকিৎসাসেবা আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাজেকের স্থানীয় লুসাই, ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর বহু মানুষ এ পরিস্থিতিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন। পরিবহন সংকটের কারণে কৃষকেরাও জুমের ফসল বাজারে নিতে সমস্যায় পড়ছেন।
অবরোধের কারণে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় সাজেকের রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, পর্যটকবাহী যানবাহন এবং অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এ খাতে প্রতিদিন কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
২২ অক্টোবর অবরোধ শুরুর দিন সাজেকে বেড়াতে আসা প্রায় তিন হাজার পর্যটক সড়কে আটকা পড়েন। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তায় তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সড়কে চলাচলের অনিশ্চয়তার কারণে পর্যটনকেন্দ্রটিতে ভ্রমণ কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
অবরোধ চলাকালে জরুরি সেবার যানবাহন, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, মরদেহবাহী গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যান এবং সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের যানবাহন চলাচলের সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে অবরোধকারী সংগঠনগুলো।
সাজেকে চলমান অচলাবস্থা কাটিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বাঘাইছড়িতে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং স্থানীয় নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, আলোচনার মাধ্যমে অবরোধের কারণগুলো সমাধান করে সড়ক যোগাযোগ পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে। তবে দাবি পূরণ, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় সাজেকের স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক করা, পর্যটন খাতের ক্ষতি কমানো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এফএস