জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে জাপানের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সঙ্গে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও। রোববার (২৫ অক্টোবর) রাত সোয়া ১২টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে টোকিওর পথে রওনা হন সরকারপ্রধান।
সফরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পাবে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। পাশাপাশি জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে রয়েছে ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন’-এর চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক। এ ছাড়া জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।
সফরসূচির অংশ হিসেবে চিবা প্রিফেকচারের ফুত্তসু শহরে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া নাগোয়া শহরে ইউনিক্লোর সদর দপ্তর ও টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে।
কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা
পররাষ্ট্রসচিবের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে।
পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এই সফরকালে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে।’
বর্তমানে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি সফরকালে স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়েও পৃথক চুক্তির বিষয়ে কাজ চলছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের অগ্রাধিকার খাতগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জাপানি কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাপানের সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
আলোচনায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও রোহিঙ্গা সংকট
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে গত এপ্রিলে একটি অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। সেই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় এবারের সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ওই বৈঠকে এশিয়াজুড়ে জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বাধীন একটি উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন জানানো হয়েছিল।
১২টি অগ্রাধিকার খাতে ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলোর কিছু ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিআইজি-বি) পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে পরিবহন ও নগর সংযোগ খাতে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়িসহ সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদন শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল খাতে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার, জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নে ৯৪০ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, নীল অর্থনীতি, পর্যটন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য খাতের জন্য আরও ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট চুক্তি, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ওপর।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী যারা
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
এ ছাড়া ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটি’র চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খানসহ সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন।
বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী জাপান
১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ইতিহাসও দীর্ঘদিনের। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে জাপান সফর করেন। অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে দেশটি সফর করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
-টিএস