পটুয়াখালীর আলিপুর মৎস্য বন্দরে জেলের জালে আবারও ধরা পড়েছে কালো দাতিনা বা Goldsilk seabream নামে পরিচিত একটি সামুদ্রিক মাছ। এটি মূলত সুন্দরবন অঞ্চল ও উপকূলীয় লোনা বা আধা-লোনা পানিতে পাওয়া যায়। অঞ্চলভেদে এই মাছকে কালো দাতিনা, সাদা দাতিনা, জাতি দাতিনা বা রাজা দাতিনা নামেও ডাকা হয়।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে মাছটি আলীপুর বন্দরের মেসার্স সাগর ফিসে নিয়ে আসা হলে খোলা বাজারে উন্মুক্ত ডাকের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ৮ কেজি ওজনের মাছটি প্রতি কেজি ৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এ প্রজাতির মাছ জেলেদের জালে খুব কম ধরা পড়ে। তাই খবর ছড়িয়ে পড়তেই মাছটি দেখার জন্য আড়তে ভিড় জমে যায়।
স্থানীয়রা জানান, মাছটি আড়তে তোলার পর প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে ‘ফ্রেশ ফিস কুয়াকাটা’র স্বত্বাধিকারী পি. এম. মুসা মাছটি কিনে নেন। তিনি মাছটি রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করবেন বলে জানান। এর আগে গত বুধবার সাড়ে ৪ কেজি ওজনের আরও একটি কালো পোয়া ৭২ হাজার টাকায় তিনি কিনেছিলেন।
এফবি মিম ট্রলারের জেলে সিদ্দিক জানান, ছোট জাটকা ইলিশের পাশাপাশি ৮ কেজি ওজনের দাতিনা মাছ পেয়ে ভালো দামে বিক্রি করতে পেরে ভালো লাগছে। এতে হঠাৎ করেই আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়।
স্থানীয় জেলেদের কাছে মাছটি ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ ও দাতিনা নামেও পরিচিত। আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে মাছটির বায়ুথলি বা এয়ার ব্লাডার চীনা ঐতিহ্যবাহী ওষুধ ও প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ায় এর দাম অনেক বেশি।
সিফাত ফিসের আড়তদার মীর মিজানুর রহমান বলেন, মাছটি ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ ও দাতিনা নামেও পরিচিত। আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে মাছটির বায়ুথলি বা এয়ার ব্লাডার চীনা ঐতিহ্যবাহী ওষুধ ও প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ায় এর দাম অনেক বেশি। তবে আজ মাছটি তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়েছে। মাঝে মাঝে এসব মাছ ৪ লাখ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজীব সরকার বলেন, মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Acanthopagrus berda।
শারীরিক গঠনের দিক থেকে কালো দাতিনা মাছটি সর্বোচ্চ ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। তবে প্রাকৃতিকভাবে আমাদের জেলেরা সাধারণত ৩৫ সেন্টিমিটারের কাছাকাছি আকারের মাছ বেশি পেয়ে থাকেন। ছোট কাঁকড়া ও চিংড়ি, ছোট মাছ, শামুক ও ঝিনুক এবং পানির তলদেশের বালু বা কাদার মধ্যে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক কৃমি এদের প্রধান খাবার। এদের চোয়াল খুব শক্তিশালী হওয়ায় সহজেই শক্ত খোলসযুক্ত কাঁকড়া বা চিংড়ি চিবিয়ে খেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উপকূলীয় পরিবেশ দূষণের কারণে এদের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। তাই ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির বিকাশ এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণে কালো দাতিনা মাছের কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া এবং এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, এ মাছগুলো কালো পোয়া মাছ। স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে দাতিনা মাছ বলা হয়। এসব মাছ সাধারণত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।
তিনি বলেন, এ মাছের বায়ুথলি থেকে বিলাসবহুল প্রসাধনী, ওষুধ এবং সুতা তৈরি হয় বলে এর চাহিদা বেশি। সব সময় এ মাছ পাওয়া যায় না। সাম্প্রতিক ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার সুফলেই জেলেরা এখন বেশি মাছ পাচ্ছেন। ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
টিএইচ/আরএন