নারায়ণগঞ্জের আলোচিত তরুণ নাট্যকার দিদারুল ইসলাম চঞ্চল হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি হত্যার নেপথ্যের কারণ। একাধিকবার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন, একই ধরনের অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল এবং নিহতের পরিবারের বারবার আপত্তি সত্ত্বেও মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন স্বজনরা।
পরিবারের অভিযোগ, তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সম্ভাব্য সাক্ষীদের যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। তারা জানান, আদালতে পাঁচবার নারাজি পিটিশন দাখিল করলেও তদন্তকারী সংস্থাগুলো কার্যকর পুনঃতদন্ত করেনি। ফলে ২০১২ সালের বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১৬ জুলাই গভীর রাতে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন চঞ্চল। সেদিন রাত ৩টার দিকে তিনি বন্ধু মীম প্রধান, রাকিব ও শফিকের সঙ্গে নগরীর ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় চা-নাশতা করেন। রাত ৩টা ৯ মিনিটে তার মোবাইলে সর্বশেষ কল আসে মীম প্রধানের আত্মীয় মেহেদী হাসান রুহিতের কাছ থেকে। এরপর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
দুই দিন পর, ১৮ জুলাই বন্দরের শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের একটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ এবং বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরদিন নিহতের বড় ভাই জোবায়ের ইসলাম পমেল মরদেহের ছবি ও পরনের কাপড় দেখে সেটি চঞ্চলের বলে শনাক্ত করেন।
২০১৫ সালের ১৯ অক্টোবর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযুক্তরা হলেন—মেহেদী হাসান রুহিত, মীম প্রধান, রাকিব, রাশেদ ও শফিক। তবে ২০১৬ সালে নিহতের মা খালেদা আক্তার রুবিনা অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি পিটিশন দাখিল করে পুনঃতদন্তের আবেদন জানান। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি পুনরায় তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিকে দেয়।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে সিআইডি একই পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে নতুন অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর মামলার বিচার শুরু হলেও সাক্ষ্যগ্রহণের কার্যক্রম এখনো ধীরগতিতে চলছে।
নিহতের বড় ভাই জোবায়ের ইসলাম পমেল অভিযোগ করেন, সিআইডির অভিযোগপত্রেও নতুন কোনো তথ্য বা সাক্ষ্য যুক্ত করা হয়নি। এমনকি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তিনি বলেন, "আমরা পাঁচবার নারাজি দিয়েছি, কিন্তু প্রতিবারই কার্যত একই ধরনের চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এতে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে আমরা শঙ্কিত।"
তিনি আরও বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা, চিকিৎসকসহ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের অনেকেই বর্তমানে অন্যত্র কর্মরত থাকায় আদালতের সমন সত্ত্বেও নিয়মিত হাজির হচ্ছেন না, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও বিলম্বিত করছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আলোচিত মামলাগুলোর পুনঃতদন্তের আশা করেছিলেন বলেও জানান পমেল। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
চঞ্চলের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় স্থানীয় কয়েকটি মসজিদে দোয়া মাহফিল, পারিবারিক মিলাদ এবং কবর জিয়ারতের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, দিদারুল ইসলাম চঞ্চল নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের বাংলা বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। মাত্র ২০ বছর বয়সেই তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল নাট্যকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। নিখোঁজ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে, ২০১২ সালের ১৩ জুলাই ঢাকা শিল্পকলা একাডেমিতে মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর উপলক্ষে মঞ্চস্থ ১০০টি নাটকের মধ্যে তার রচিত ‘বক্তাবলী’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ওই নাটকের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের স্বীকৃতি অর্জন করেন।
এসএস