দেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁ। বিস্তীর্ণ আমবাগান, উন্নত জাতের চাষাবাদ এবং কৃষকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় প্রতিবছরই উৎপাদনের নতুন রেকর্ড গড়ছে এ জেলা। এবারও সেই ধারাবাহিকতায় জেলায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি।
তবে বিপুল উৎপাদনের পরও আন্তর্জাতিক বাজারে ‘নওগাঁর আম’ নামে স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড পরিচিতি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। সেই বাস্তবতা থেকে ব্র্যান্ডিং, নিরাপদ উৎপাদন ও রপ্তানি সম্প্রসারণের বার্তা সামনে রেখে নওগাঁয় শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী জাতীয় ফল ও আম মেলা।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বেলা ১১টার দিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়ি প্রাঙ্গণে মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। ১৮ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
মেলায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৬টি স্টলে ৭৭ প্রজাতির আমসহ শতাধিক দেশি ও বিদেশি ফল প্রদর্শন করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে আম্রপালি, ফজলি, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আশ্বিনা, গোপালভোগ, কাটিমন, বারোমাসি ও বানানা ম্যাংগোসহ নানা জাতের আম। পাশাপাশি জৈব সার, নিরাপদ ফল উৎপাদন প্রযুক্তি, কীটনাশকমুক্ত আম চাষ, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ফলের চারা এবং হর্টিকালচার কেন্দ্রের উৎপাদিত আচারসহ নানা কৃষিপণ্যও প্রদর্শন করা হচ্ছে।
উদ্বোধন শেষে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে ‘রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সভায় সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম, ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মনির আলী আকন্দ, অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) খলিলুর রহমান, অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রেজাউল করিম, অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মেহেদুল ইসলাম, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বদরুদ্দোজা, জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা বিষ্ণু পদ সাহাসহ কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, কৃষক ও কৃষাণীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “নওগাঁ এখন শুধু ধানের জেলা নয়, আমের জেলা হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। এখানকার আম্রপালি, ফজলি, ল্যাংড়া ও অন্যান্য জাতের আম গুণগত মানে দেশের সেরা আমগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে উৎপাদনের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ব্র্যান্ডিং ও রপ্তানিতে। নওগাঁর আমকে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিত করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করা, আধুনিক প্যাকেজিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। সরকারের কৃষি ও বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আমরা চাই নওগাঁর আম শুধু দেশের বাজারেই নয়, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে যাক। এতে কৃষক লাভবান হবেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে এবং জেলার অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নওগাঁ বর্তমানে দেশের শীর্ষ আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোর অন্যতম। বিশেষ করে আম্রপালি, ফজলি, ল্যাংড়া ও হিমসাগরের জন্য জেলার সুনাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপান, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে সীমিত পরিসরে নওগাঁর আম রপ্তানি শুরু হলেও সম্ভাবনার তুলনায় সেই পরিমাণ এখনও খুবই কম। আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ী অবস্থান গড়ে তুলতে হলে নিরাপদ উৎপাদন, ট্রেসেবিলিটি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক সংরক্ষণ ও প্যাকেজিং ব্যবস্থার ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
মেলায় অংশ নেওয়া কৃষক হাবিব রতন জানান, উৎপাদন বাড়লেও বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি সরকারি সহায়তা ও রপ্তানি সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানান।
দর্শনার্থীদের অনেকেই বলেন, একই স্থানে এত বৈচিত্র্যময় আম ও ফলের সমাহার সচরাচর দেখা যায় না। নতুন ও বিদেশি জাতের আম সম্পর্কে জানার পাশাপাশি নিরাপদ ফল উৎপাদন সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
আয়োজকদের মতে, দেশীয় ফলের পরিচিতি বৃদ্ধি, উন্নত জাতের ফল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা এবং রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে ‘নওগাঁর আম’কে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ববাজারে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়ার প্রত্যাশাও রয়েছে তাদের।
রেকর্ড উৎপাদনের সম্ভাবনা, হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের নতুন উদ্যোগ—সব মিলিয়ে এবার নওগাঁর আম শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, জেলার অর্থনীতি ও সম্ভাবনার নতুন পরিচয় হয়ে উঠছে।
কেএইচ/আরএন