দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন রাজপথ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই আলোচনায়। সেটি হলো, আওয়ামী লীগ কি আবারও রাজনীতিতে ফিরছে? সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের একটি বক্তব্য এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এ প্রশ্নকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত নিয়ে এনসিপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সম্প্রতি সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে একটি কৌশলগত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের পদধারী হিসেবে বা দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তবে ব্যক্তি হিসেবে কেউ যদি আওয়ামী লীগপন্থী হন এবং তার ভাবমূর্তি গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা থাকবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বক্তব্যের অর্থ হলো, দলীয়ভাবে বা দলীয় প্রতীকে না পারলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ কার্যত উন্মুক্ত থাকছে। অনেকেই এটিকে দলটির রাজনৈতিক পুনরুত্থানের প্রথম ধাপ বা ‘ব্যাকডোর এন্ট্রি’ হিসেবে দেখছেন।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার আলোচনা শুধু বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মাঠপর্যায়ের কিছু ঘটনাও এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছে। সম্প্রতি কারামুক্ত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেত্রী সেলিনা হায়াৎ আইভী। সংশ্লিষ্টদের মতে, তার মুক্তি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে ছোটখাটো মিছিল-মিটিংয়ের চেষ্টা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতাকর্মীদের সক্রিয় হওয়ার নানা আলোচনা দেখা যাচ্ছে। অনেকের ধারণা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি দলটির সাংগঠনিক প্রস্তুতিরই অংশ।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের এই আলোচনা বা তৎপরতাকে মেনে নিতে নারাজ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ। তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এনসিপি নেতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা দেশের মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের কোনো ছদ্মবেশে রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া হবে না।
পাশাপাশি এ বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক আশরাফ কায়সার। একটি টকশোতে তিনি বলেন, “রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। এর মধ্যেই ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টা ছাত্র-জনতা কঠোরভাবে প্রতিহত করবে।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, আওয়ামী লীগ পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলে দেশের একটি অংশ তার বিরোধিতায় রাজপথে নামতে প্রস্তুত।
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেশের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একদিকে আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তিগুলো এমন যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অনড় অবস্থান নিয়েছে। ফলে বিষয়টি আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।