রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা শ্রমিক দলের আহবায়ক মাসুম বিল্লাহ কিলিং মিশনে অংশ নেয় শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানীর’ ৮ জন কিলার। মিশন সফল করতে তিন গ্রুপ কাজ করেছে। আর অগ্রীম হিসেবে প্রত্যেক কিলারকে নগদ ৫০ হাজার করে টাকা দিয়েছে ‘বি কোম্পানী’।
গতকাল বুধবার রাতে হত্যাকান্ডের পর জনতার সহযোগীতায় আটক অশোক ঘোষ পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এমনই তথ্য দিয়েছে। তাকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এদিকে রাতেই হত্যা মিশনে থাকা জাভেদ নামের আরেক কিলারকে আটক করেছে পুলিশ।
এদিকে অস্ত্রসহ আটক অশোক ঘোষের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে বৃহস্পতিবার মামলা দায়ের করা হয়েছে। এস আই আমিনুল বাদী হয়ে খুলনা সদর থানায় মামলাটি দায়ের করেন।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, খুলনার প্রাণ কেন্দ্র ডাকবাংলো মোড়ে বাটার দোকানে ভেতর কুপিয়ে ও গুলি করে রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা শ্রমিক দলের আহবায়ক মাসুম বিল্লাহকে হত্যা করা হয়। গতকাল বুধবার রাত ৯ টার দিকে ঊদ মার্কেট করতে আসা ক্রেতাদের সামনেই এ হত্যাকান্ড ঘটে। ফলে ডাকবাংলো মোড়ের আশপাশে ৭-৮ টি মার্কেটে আতংক ছড়িয়ে পড়ে।
হত্যাকান্ড ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় বিদেশী পিস্তলসহ অশোক ঘোষ (৩৮) নামে বি কোম্পানীর সক্রিয় সদস্যকে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সন্ত্রাসী হামলায় নিহত মাসুম বিল্লাহ উপজেলার বাগমারা গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন মুন্সির ছেলে।
যেভাবে হত্যা মিশন সফল
ডাকবাংলো মোড়ের কায়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, মাসুম বিল্লাহ ডাকবাংলো মোড় থেকে ২০০ গজ দুরে পিকচার প্যালেস মোড়ে অবস্থান করছিলেন। এসময়ে কয়েকজন সন্ত্রাসী তাকে ধাওয়া দেয়। তাদের ধাওয়া খেয়ে তিনি দৌড়ে ডাকবাংলো মোড়ের বাটা শোরুমে ঢুকে পড়েন। সন্ত্রাসীরা পিছু নিয়ে বাটার দোকানের ভেতর প্রবেশ করে কুপিয়ে ফ্লোরে ফেলে দিয়ে পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
ঘটনার সময় ওই এলাকায় ডিউটিরত ছিলেন টিআই মাহমুদ আলম। তিনি বলেন, পিকচার প্যালেস মোড় থেকে লোকজন দৌড়ে আসছে। তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা জানায় এখানে খুন হয়েছে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি বাটার মধ্যে থেকে বের হয়ে এক ব্যক্তি হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। কোমরে পিস্তল গুজছে এমন দৃশ্য দেখে ওই যুবককে পেছন থেকে উপস্থিত জনতা ধাওয়া দেয়। সে তখন সোজা ফেরীঘাটের দিকে এগোতে থাকে। আমি পেছন থেকে লোকজনকে তাকে ধারার জন্য অনুরোধ করি। সামনে গাড়ি থাকায় সে আর দৌড়াতে পারেনা।
তখন আমি পুলিশ পরিচয় দিয়ে জনতাকে তাকে ধরার অনুরোধ করি। তখন জাপটে তাকে পিস্তলসহ আটক করি। উপস্থিত জনতাকে হাত ধরে রাখার জন্য অনুরোধ করেন তিনি। যেন তিনি ছুটে যেতে না পারেন এবং পিস্তল ব্যবহার করতে না পারে। পরবর্তীতে পিস্তল হাতে নিয়ে ডাকবাংলো মোড়ে উপস্থিত পুলিশকে খবর দিতে বলেন। খবর পেয়ে তিনজন সার্জেন্ট ঘটনাস্থলে যায় এবং তাকে এখানে নিয়ে আসি। তাকে জাতীয় পার্টির অফিসের বিপরীত দিক থেকে আটক করা হয়। আটক সন্ত্রাসী অশোক ঘোষ হেটে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো।
ডাকবাংলো মোড়ের বাটা শোরুমের ম্যানেজার বলেন, দোকানে ক্রেতার প্রচুর চাপ ছিল। বিল করছিলাম। বাইরে থেকে এক লোক দৌড়ে দোকানে প্রবেশ করে। এরপর আর কিছু জানিনা। আমরা যে যার মতো নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেই।
ভিডিও ফুটেজে যা দেখা গেল
বাটার শোরুমে ব্যস্ত কর্মচারী ও ক্রেতারা। ঠিক এই মুহুর্তে টুপি ও গেঞ্জি পরা এক ব্যক্তি দৌড়ে বাটার দোকানে প্রবেশ করে। এর মধ্যে অল্প বয়সী কয়েকজন যুবক তাকে অনুসরন করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে। হেলমেট পরা অবস্থায় এক যুবক তার বুক লক্ষ্য করে গুলি করে। শরীরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মাসুম বিল্লাহ ওরফে মাসুম মিনা দোকানে ক্যাশ কাউন্টারের সামনে পড়ে যান। পরে তাকে উদ্ধার করে খুমেক নিলে সেখানকার চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। ৩-৫ সেকেন্ডের মধ্যে হত্যা মিশন শেষ করে সন্ত্রাসীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
সন্ত্রাসী অশোক ঘোষ পিটিয়ে ক্ষোভ মেটাতে চেয়েছিল উত্তেজিত জনতা
সন্ত্রাসী দলের সদস্য অশোক ঘোষ আটক হওয়ার পর এলাকায় উপস্থিত জনতা একদফায় মারধোর করে। তখন পুলিশ তাকে জনতার কাছ থেকে টেনে নিয়ে একটি জুতার দোকোনে আটকে রেখে দেয়। ফলে উত্তেজিত জনতা ডাকবাংলো মোড়ে অবস্থান নিয়ে পুলিশকে উদ্দেশ্যে করে ভুয়া ভুয়া বলে শ্লোগান দিতে থাকে। সময় পার হওয়ার সাথে সাথে সেখানে আরও জনতা উপস্থিত হতে থাকলে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। সেখানে ব্যারিকেড দিয়ে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পুলিশ অশোক ঘোষকে থানায় নেয়। এসময় থানাসহ আশপাশের এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে থানার রাস্তায় সেনাবাহিনীসহ অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ফলে ওই রাতে জনগণকে শান্ত রাখতে সামর্থ্য হয় আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মিশনে অংশ নেয় ‘বি-কোম্পানী’র তিন গ্রুপ
জানতে চাইলে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) তাজুল ইসলাম বলেন, আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব শত্রুতাকে কেন্দ্র করে মাসুম বিল্লাহ হত্যাকান্ডটি সংগঠিত হতে পারে। আমরা অধিকতর তদন্ত করে দেখছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হত্যা মিশন সফল করতে বি কোম্পানীর তিনটি গ্রুপ কাজ করেছে। তাদের মধ্যে দুজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। একজন অস্ত্রধারীকে আমরা ধরতে পেরেছি। অপর গ্রুপের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র। তৃতীয় গ্রুপটি কিলারদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে ছিল। কিলিং মিশনে ছিল বি কোম্পানীর ৮ সদস্য। এদের মধ্যে আশোক ঘোষ ও জাভেদকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
এই কর্মকর্তা বলেন, আশোক ঘোষকে নিয়ে সারারাত অভিযান চালিয়ে জাভেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদের নামও আমরা জানতে পেরেছি তাদেরকে ধরার চেষ্টা চলছে। রাতে গ্রেপ্তার হওয়া জাভেদের বাড়ি গোপালগঞ্জের চন্দ্র দিঘলিয়া গ্রামে। সে খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকায় থাকতো।
জানতে চাইলে তাজুল ইসলাম আরো বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া অশোক ঘোষ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। হত্যা মামলা হওয়ার পর তাকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নিহত মাসুম বিল্লাহর স্ত্রী বাদি হয়ে রাতে হত্যা মামলা দায়ের করবেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।
কিলারদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা অগ্রীম প্রদান
এদিকে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মাসুম বিল্লাহ হত্যা মিশনে থাকা কিলারদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অগ্রীম প্রদান করা হয়। হত্যাকান্ডটি ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। পরিকল্পনা অনুযায়ী কিলাররা গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় নগরীর ময়লাপোতা মোড়ে একত্রিত হয়। তারা তিনটিস্থান থেকে আসে। তবে কোন কোন এলাকা থেকে এসেছে তা জানাযায়নি। এরপর মাসুম বিল্লাহর অবস্থান সনাক্ত করে মিশনে অংশ নেয়।
মাসুমের শরীরে তিনটি গুলির চিহ্ন
জানতে চাইলে খুলনা সদর থানার ওসি কবীর হোসেন বলেন, নিহত মাসুম বিল্লাহর শরীরে তিনটি গুলি ও একাধিক ধারালো অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের ঘটনায় এস আই আমিনুল বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। অস্ত্রসহ আটক হওয়া অশোক ঘোষ একজন পেশাদার খুনী। অশোক হত্যাকান্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দিয়েছেন, যা তদন্তের স্বার্থে এখনই বলা যাচ্ছেনা। প্রাথমিক তদন্তে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব শত্রুতাকেই কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। হত্যা মামলা রাতে হতে পারে বলে তিনি জানান।
আমার বাবার সাথে কারো শত্রুতা ছিলনা
বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা শ্রমিক দলের আহবায়ক মাসুম বিল্লাহর ময়না তদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই দাফন হবে। হাসপাতালের মর্গের সামনে কথা হয় পরিবারের সদস্যের সঙ্গে।
নিহত মাসুম বিল্লার ছেলে রেজওয়ান হোসাইন মিনা বলেন, আমার বাবার সাথে কারো শত্রুতা নেই। শত্রুতা থাকলে আমাদের বলতেন। তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। মানুষের উপকার করতেন। আমরা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে হত্যার বিচার চাই।
মাসুম বিল্লার ভাগ্নে মাসুদ অর রশিদ বলেন, আমার মামা সাংগঠনিক লোক ছিলেন। তিনি খুবই অল্প বয়স থেকে স্বচ্ছ রাজনীতি করতেন। মামার কোন শত্রু ছিলনা। এভাবে মামাকে হত্যা করা হবে ভেবে হতবাগ হয়েছি।
বিভিন্ন সংস্থার ছায়া তদন্ত
এদিকে মাসুম বিল্লাহ হত্যার পর র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট, পিবিআই, সিআইডি ও পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। এছাড়া হত্যার কারণ ও হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে। এসব সংস্থা তথ্য দিয়েও সহযোগীতা করছে বলে জানাগেছে।
এসআর