গত বছরের (২০২৫) জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খুলনার বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে ৪৮টি ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এদের মধ্যে ৩০টি শনাক্ত এবং টিস্যু পঁচে যাওয়ার কারণে বাকিগুলো অশনাক্ত রয়েছে। এর মধ্যে আট জন নারী, ৩৩ জন পুরুষ ও সাতটি শিশুর মরদেহ রয়েছে। লাশ উদ্ধার ঘটনায় ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন থানায় ১৪টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
নদী থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নাগরিকদের মাঝে চরম উৎকণ্ঠা দেখা দেয়।
নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে একটি, ফেব্রুয়ারি মাসে দুটি, মার্চ মাসে চারটি, এপিল মাসে তিনটি, মে মাসে ছয়টি, জুন মাসে ছয়টি, জুলাই মাসে তিনটি, অগাস্ট মাসে আটটি, সেপ্টেম্বরে ছয়টি, অক্টোবরে তিনটি, নভেম্বরে চারটি এবং ডিসেম্বরে দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হয় খুলনার বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে।
জানতে চাইলে নৌ পুলিশ সুপার ডা. মুহাম্মদ মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, 'সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা ও পিরোজপুর নিয়ে নৌ পুলিশ খুলনা অঞ্চল গঠিত। নদী থেকে আমরা তিন ধরনের মৃতদেহ পাই। হত্যাকাণ্ড, আত্মহত্যা এবং সাধারণ মৃত্যু। সাধারণ মৃত্যুর লাশগুলো জিডিমূলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় ১৪টি মার্ডার মামলা এবং অপমৃত্যু ২৬টি এবং মামলা ছাড়া আটটি মরদেহ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছি। ১৪টি হত্যা মামলায় পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।'
গ্রেপ্তারের সংখ্যা কম কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'মৃতদেহ প্রথমে শনাক্ত হতে হবে। তাহলে বুঝতে পারি কে বা কোন ব্যক্তি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। না চিনতে পারলে আর কোনো সুযোগ থাকেনা। তাছাড়া এখানকার পানি নোনা, ড্যাম ও বৃষ্টিতে লাশগুলে দ্রুত পঁচে যায়। তিন দিনের বেশী হলে টিস্যুগুলো পঁচে তার পরিচয় শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে হয়ে পড়ে। জোয়ার ভাটায় বিভিন্ন এলাকা থেকে লাশগুলো ভেসে আসে। সে ক্ষেত্রে সারাদেশে খবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এর ফলাফল ভালো আসে না।'
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, '১-২ দিনের নবজাতক বাচ্চার লাশ পাওয়া যায়। পুলিশের মধ্যে একটি চর্চা আছে যে এগুলোকে তারা হত্যা মামলা হিসেবে দেখত না। শিশু তো ঘটনাস্থলে হেঁটে আসেনি। তাকে কেউ না কেউ ফেলে যায়। তাই শিশুদের মরদেহগুলো শনাক্ত করা যায়না। এগুলো আমরা মার্ডার মামলা হিসেবে নেই। মানুষ শনাক্ত হয় না আর শিশু শনাক্ত হবে কি করে। এ মামলাগুলোর বাস্তব সমাধান হয় না। আমরা মার্ডার মামলা নেই। এ মামলাগুলোর আসামি গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না।'
তিনি বলেন, 'মরদেহ দেখে যদি সন্দেহ হয় তাহলে হত্যা মামলা করি। রিপোর্ট যদি নেগেটিভ হয় তাহলে অপমৃত্যু। এ রকম দুটি পেয়েছি। সন্দেহ হলে আমরা তা উঁচু ধাপে নিয়ে যাই। তাছাড়া আমরা যতগুলো মরদেহ পেয়েছি ততগুলোর ঘটনাস্থল নদী নয়। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। সকল ঘটনার ঘটনাস্থল স্থলভাগ এবং নৌ পুলিশ নদী কেন্দ্রীক যে তথ্য ভান্ডার সেটি আমাদের কাছে কম বেশি আছে। কিন্তু স্থল কেন্দ্রীক কোন কোন হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেখানকার চক্রগুলো যদি পেশাদার অপরাধী বা সংঘবদ্ধ অপরাধী হয়ে থাকে তাহলে তাদের ব্যাপারে আমাদের তথ্য কম।'
তিনি আরও বলেন, 'তখন এই ঘটনার ফলে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে সেটির তদন্ত করতে গিয়ে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। যেহেতু স্থলভাগ আমাদের অধিক্ষেত্র নয়। তবুও এ ক্ষেত্রে আমরা স্থানীয় পুলিশ, র্যাব এবং পিবিআইয়ের সহযোগীতা নিয়ে থাকি। একটি স্থান থেকে অন্য স্থানে গেলে তদন্তে সময় লাগে। তাছাড়া আমাদের লোকবল কম। থানা ফাঁড়িতে কম লোক দিয়ে কাজ করছি।'
নদী কেন্দ্রীক নিরাপত্তার জন্য টহল, পেট্রোল সব সময় লাগে এটি নিশ্চিত করে তদন্ত করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। লোকবল বেশি হলে ঠিকমতো কাজ করা সম্ভব হতো বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
এমএ