আসন্ন ৩ নভেম্বরের মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ব্যালটে না থাকলেও এই ভোটের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—বিশেষ করে তিনি তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের মুখোমুখি হবেন কি না। বর্তমান জরিপ, সেনেটের নির্বাচনী মানচিত্র এবং মার্কিন আইন বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের দিনে হোয়াইট হাউস হারাবেন না, কারণ তিনি সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। তবে আগামী মঙ্গলবার প্রতিনিধি পরিষদে (House of Representatives) ডেমোক্র্যাটদের জয় তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর পথ প্রশস্ত করতে পারে। আর তাঁকে পদচ্যুত করতে হলে সেনেটে প্রয়োজন হবে রিপাবলিকানদের এক অভাবনীয় ও বিশাল বিদ্রোহের।
আগামী মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মার্কিন ভোটাররা হাউসের ৪৩৫টি আসনেই এবং সেনেটের ৩৫টি আসনে রায় দেবেন। এই নির্বাচনের ফলাফল ওভাল অফিসের ক্ষমতার হাতবদল ঘটাবে না বটে, তবে ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের শেষ দুই বছর কতটা ক্ষমতার অধিকারী থাকবেন এবং তাঁকে আরেকটি অভিশংসনের মোকাবিলা করতে হবে কি না, তা অনেকাংশেই নির্ধারণ করে দেবে।
বর্তমানে সেনেটে ৫৩-৪৭ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে রিপাবলিকানরা (ডেমোক্র্যাটদের সাথে ভোট দেওয়া দুই স্বাধীন সদস্যসহ)। চেম্বারটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে ডেমোক্র্যাটদের নিট ৪টি আসন বেশি প্রয়োজন।
সংবিধান অনুযায়ী অভিশংসনের শর্ত
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমেই প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস কোনো প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করতে পারে। তবে পদচ্যুত করতে হলে সেনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে দোষী সাব্যস্ত করতে হবে; অর্থাৎ সব সদস্য উপস্থিত থাকলে ১০০ জনের মধ্যে অন্তত ৬৭ জন সেনেটরের সমর্থন লাগবে।
ট্রাম্প এর আগে দুবার অভিশংসিত হলেও প্রতিবারই খালাস পান। ২০২১ সালের বিচারে ৫৭ জন সেনেটর তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, যা প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে ১০ ভোট কম ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে হাউস রিপাবলিকানদের সতর্ক করে ট্রাম্প বলেছিলেন, দল যদি মিডটার্মে হেরে যায়, তবে বিরোধীরা তাঁকে "অভিশংসন করার কোনো না কোনো কারণ ঠিকই খুঁজে বের করবে।"
জনমত জরিপে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা
১৯ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার নেমে আসে ৩১ শতাংশে, যা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে রেকর্ড সর্বনিম্ন। ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত আরেকটি সমীক্ষায় তা সামান্য বেড়ে ৩২ শতাংশে দাঁড়ায়। ঐ সমীক্ষায় দেখা যায়, নিবন্ধিত ভোটারদের ৪৭ শতাংশ কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের পছন্দ করছেন, যেখানে রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছে ৩৬ শতাংশ।
বর্তমান প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে আসছে অর্থনীতি। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এপি-নোরক (AP-NORC) জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা সমর্থন করেছেন (যা ওই জরিপের ইতিহাসে সর্বনিম্ন) এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সন্তুষ্ট মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ। প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোটারের মতে, তাঁদের নিত্যদিনের অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য প্রেসিডেন্টের নীতিগুলোই দায়ী।
তরুণ ভোটারদের মধ্যেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে। সিএনএন-এর বিশ্লেষক হ্যারি এন্টেনের আলোচিত ফক্স নিউজের এক জরিপে দেখা গেছে, ৩০ বা তার কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের নিট জনপ্রিয়তা মাইনাস ৫০। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ ভোটারই মূল্যস্ফীতি দমনে তাঁর ব্যর্থতার সমালোচনা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের জন্য হাউস বা প্রতিনিধি পরিষদ জয় করা তুলনামূলক সহজ হবে। আগস্ট মাসের ফিফটিপ্লাসওয়ান মডেল অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা ৮৫ শতাংশ এবং সেনেটে ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত ডিশিশন ডেক্স এইচকিউ-এর পূর্বাভাসে সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের ৫৬ শতাংশ জয়ের সম্ভাবনা ও ৫১টি আসন পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
পদচ্যুতি কেন প্রায় অসম্ভব?
অভিশংসন এবং চূড়ান্ত পদচ্যুতির মধ্যবর্তী দূরত্ব বেশ দীর্ঘ। সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের বর্তমান আসন সংখ্যা ৪৭টি। তারা যদি সর্বোচ্চ ৫৬টি আসনও জয় করে, তবুও দোষী সাব্যস্ত করতে হলে অন্তত ১১ থেকে ১৬ জন রিপাবলিকান সেনেটরের ক্রস-ভোট বা দলত্যাগী সমর্থন প্রয়োজন হবে। অথচ ২০২১ সালে ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসের বাইরে ছিলেন, সেবারও মাত্র সাতজন রিপাবলিকান তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন।
রিপাবলিকানরা যদি সেনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তবে ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করা কার্যত অসম্ভব। প্রেডিকশন মার্কেট ও রাজনৈতিক পূর্বাভাসদাতারা ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে হাউস এবং রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে সেনেট—এই বিভক্ত ফলাফলকেই সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হিসেবে দেখছেন।
যেসব বিষয় ট্রাম্পের জন্য স্বস্তিদায়ক
সেনেটের মানচিত্র: ডেমোক্র্যাটদের যেসব আসন ছিনিয়ে নিতে হবে, তার অনেকগুলোই এমন রাজ্যে অবস্থিত যেখানে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন (যেমন- আলাস্কা ও আইওয়া)।
জ্বালানি নীতি ও প্রচারণা: বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ এবং ট্রাম্পের টানা নির্বাচনী প্রচারণা ও টেক্সাসে রেকর্ড আগাম ভোট রিপাবলিকান শিবিরে আশার সঞ্চার করেছে।
যেসব বিষয় ট্রাম্পের জন্য বিপদের কারণ
সংঘাত ও মূল্যস্ফীতি: দীর্ঘস্থায়ী ইরাক যুদ্ধ এবং শ্রম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী আগস্ট পর্যন্ত ১২ মাসে ভোক্তা মূল্য ৩.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
নির্বাচন পরিচালনা ও আইনি জটিলতা
শেষ মুহূর্তে বিচার বিভাগের কিছু পদক্ষেপ নির্বাচনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২০ হাজার সম্ভাব্য অ-নাগরিক ভোটারের ব্যালট আলাদা করা এবং আলাস্কায় রিপাবলিকান প্রার্থীর নামের সাথে মিল থাকা নিয়ে সৃষ্ট আইনি জটিলতা আদালতে গড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সরাসরি নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের কোনো সাংবিধানিক এখতিয়ার নেই। ফলে আদালতের রায়ে এসব আইনি প্রচেষ্টা আটকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। নতুন এই কংগ্রেস আগামী বছরের ৩ জানুয়ারি ২০২৭ সালে বসবে।
ভোটের বাক্সে যা লক্ষ্য রাখা উচিত
১. ওহাইও, নর্থ ক্যারোলিনা, মেইন ও টেক্সাসের প্রাথমিক নির্বাচনী ফলাফল, যা সেনেটের ভাগ্য কোন দিকে যাচ্ছে তা দ্রুত ইঙ্গিত দেবে।
২. আলাস্কার র্যাঙ্কড-চয়েস ভোট গণনা এবং চলমান আইনি লড়াই।
৩. রিপাবলিকানরা সেনেটে অন্তত ৫০টি আসন ধরে রাখতে পারে কি না (যা যেকোনো অভিশংসন বা পদচ্যুতি রুখে দিতে যথেষ্ট)।
৪. ক্যালিফোর্নিয়া ও আলাস্কা মামলা এবং প্রত্যয়নের সময়সীমা নিয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায়।
সংক্ষেপে, আগামী মঙ্গলবারের নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি সরাসরি ঝুঁকিতে না থাকলেও ঝুঁকিতে রয়েছে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি। ট্রাম্পকে পদচ্যুত করতে হলে আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে নজিরবিহীন সংখ্যক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার দলবদল প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত দুরূহ।