ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় গত আগস্ট থেকে অন্তত ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে রয়েছেন প্রায় ৬ হাজার ১০০ অন্তঃসত্ত্বা নারী।
তাদের মধ্যে ৬০০ জনের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, সংঘাতের কারণে এসব নারীর নিরাপদে সন্তান জন্ম দেওয়ার সুযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে।
বিশেষ করে তাইজ প্রদেশ ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত ওসিএইচএর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইয়েমেনে থাকা ৬৫ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীও ক্রমেই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন।
সংঘাতের কারণে বিভিন্ন সেবা ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তায় জাতিসংঘ বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা দল ও ধাত্রী পাঠিয়েছে। ত্রাণ সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার মানুষের কাছে খাদ্য, স্বাস্থ্যবিধি উপকরণ ও জরুরি নগদ সহায়তা পৌঁছে দিতে পেরেছে। অর্থাৎ বাস্তুচ্যুতদের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ সহায়তা পেয়েছেন।
সৌদি আরবেও ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত
ইয়েমেনে লড়াইয়ের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবেও পড়েছে। শনিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদ অঞ্চলের আকাশে একটি ‘শত্রু ড্রোন’ শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ঘটনাস্থল পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। দুই দিনের মধ্যে রিয়াদ অঞ্চলে এটি দ্বিতীয় ড্রোন ধ্বংসের ঘটনা।
এর আগে শুক্রবার সৌদি আরব জানিয়েছিল, মক্কা, মদিনা ও রিয়াদের কাছে কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া একটি হুথি ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়।
তবে হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি এসব দাবিকে ‘জঘন্য মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন। ইসলাম ধর্মের পবিত্র দুই শহরকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগও বারবার অস্বীকার করেছে গোষ্ঠীটি। তবে সৌদি রাজধানী, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার দায় তারা স্বীকার করেছে।
গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ও বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার শুক্রবার অভিযোগ করেছে, হুথিরা অন্তত তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে। এই প্রাসাদটি দেশটির অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনে সরকারের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। আগের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মেরামতের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরটি আবার চালু হয়েছিল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ও বিমানবন্দর—দুটিই হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ইয়েমেনের সরকার এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, বিমানবন্দরে হামলা নাগরিকদের স্বার্থের ওপর সরাসরি আঘাত। অন্যদিকে, সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নুজাইলি দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ৩৩৬ হুথি যোদ্ধা ও কমান্ডারকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। এ ছাড়া ১১২টি যানবাহন, অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তাইজ, মারিব, আল-জাওফ ও আল-বায়দা অঞ্চলে হুথিদের অবস্থান, কমান্ড সেন্টার ও সরবরাহপথ লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান ও রকেট হামলা চালানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।
বাড়ছে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি
জাতিসংঘের হিসাবে, গত আগস্ট থেকে ইয়েমেনে সংঘাতে ২৭০ জন বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনা যাচাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৮ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অর্ধেকই শিশু।
সরকারপন্থী সংবাদ সংস্থা সাবার তথ্য অনুযায়ী, তাইজ প্রদেশে হুথিদের হামলায় এক নারী নিহত এবং এক শিশুসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। গোলাবর্ষণ ও গুলিতে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে।
এদিকে, ইয়েমেন নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস জানিয়েছে, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাইজ প্রদেশে তাদের মাঠপর্যায়ের দল হুথিদের হাজার হাজার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৮৯ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৮ শিশু ও ২৭ নারী রয়েছেন। এ ছাড়া ২৩টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ৩০০ জনের বেশি মানুষকে অপহরণ বা জোরপূর্বক গুম করার অভিযোগও তুলেছে সংগঠনটি।
সংঘাতের কারণে বিভিন্ন সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশপাশের প্রায় ২০ লাখ মানুষ খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও পানির সংকটে পড়েছেন। বিশেষ করে তাইজ শহরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। চলতি মাসে শহরটির দক্ষিণে আল-তুরবাহসহ কয়েকটি এলাকা দখলে নেওয়ার পর হুথিরা তাইজ শহরকে আরও শক্তভাবে ঘিরে ফেলেছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে চলছে ইয়েমেনের যুদ্ধ
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এতে সরকার দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য হয়। পরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট সরকারপন্থী বাহিনীর সমর্থনে যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করলে সংঘাত আরও তীব্র হয়।
দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালায়। এতে হুথি প্রতিনিধিদল বহনকারী একটি বিমান অবতরণ করতে পারেনি। এরপর নতুন করে লড়াই শুরু হয়। হুথিরা ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, হুথিদের দখলে থাকা এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের সরকার।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা