মহাবিশ্বে কেন পদার্থ টিকে আছে এবং বিগ ব্যাংয়ের পর কীভাবে নক্ষত্র, গ্রহ ও প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব হলো তার নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, কয়েক দশক ধরে উপেক্ষিত একটি রহস্যময় ভারী নিউট্রিনো কণা মহাবিশ্বের প্রাথমিক বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। এমনকি এর প্রভাবে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সংকেতেও মিলতে পারে মহাবিশ্বের অতীতের প্রমাণ।
যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্সডেইলিতে ১ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটন এবং ভারতের কানপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি'র গবেষকেরা এ তত্ত্ব দিয়েছেন। তাঁদের গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Physical Review Letters সাময়িকীতে।
মহাবিশ্বে পদার্থ টিকে থাকার রহস্য
পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য হলো, মহাবিশ্বে পদার্থের অস্তিত্ব কেন রয়েছে? বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্বে পদার্থ ও প্রতিপদার্থ প্রায় সমান পরিমাণে তৈরি হয়েছিল। এই দুই ধরনের কণা একে অপরের সংস্পর্শে এলে ধ্বংস হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
যদি পদার্থ ও প্রতিপদার্থ সমান পরিমাণে থাকত, তাহলে প্রায় সব পদার্থই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে নক্ষত্র, গ্রহ কিংবা প্রাণ সৃষ্টির মতো কোনো বস্তুগত উপাদান অবশিষ্ট থাকত না।
কিন্তু বাস্তবে মহাবিশ্বে পদার্থের আধিক্য রয়েছে। কেন এই অসমতা তৈরি হয়েছিল, তা বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই অমীমাংসিত প্রশ্ন।
উপেক্ষিত ভারী নিউট্রিনোর ভূমিকা
এই রহস্যের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা খুঁজতে গবেষকেরা ‘ডিকাপলড হেভি নিউট্রিনো’ নামের একটি বিশেষ কণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি সাধারণ নিউট্রিনোর তুলনায় অনেক বেশি ভারী বলে ধারণা করা হয়। সাধারণ পদার্থের সঙ্গে এই কণার মিথস্ক্রিয়াও অত্যন্ত দুর্বল।
এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মহাবিশ্বের বিবর্তনে কণাটির উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা নেই।
তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, কণাটির দীর্ঘ আয়ুষ্কাল একে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব শীতল হওয়ার সময় কণাটি দীর্ঘদিন টিকে ছিল। একপর্যায়ে এটি সাময়িকভাবে মহাবিশ্বের মোট শক্তির ঘনত্বে আধিপত্য বিস্তার করে এবং পদার্থ-প্রধান একটি পর্যায়ের সূচনা ঘটায়।
গবেষণার অন্যতম লেখক যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের ড. রিশভ রোশন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই ভারী নিউট্রিনোকে পদার্থবিজ্ঞানের অপ্রাসঙ্গিক একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু এর ক্ষয়প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর হওয়ায় বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব শীতল হওয়ার সময় এটি যথেষ্ট দীর্ঘকাল টিকে ছিল। ফলে সাময়িকভাবে মহাবিশ্বের শক্তির ঘনত্বে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
পদার্থ ও প্রতিপদার্থের ভারসাম্যে পরিবর্তন
গবেষকদের মতে, ভারী নিউট্রিনো কণাটি মহাবিশ্বের প্রাথমিক তাপমাত্রার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে ইলেকট্রনসহ বিভিন্ন লেপ্টন কণা এবং তাদের প্রতিকণার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার সময় ও পরিবেশ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে এটি।
এ প্রক্রিয়ায় হিগস বোসন নামের মৌলিক কণাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হিগস বোসন এমন একটি কণা, যা মৌলিক কণাগুলোর ভর অর্জনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষকদের প্রস্তাবিত তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারী নিউট্রিনো মহাবিশ্বের প্রাথমিক তাপমাত্রা পরিবর্তন করে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
ড. রিশভ রোশনের ভাষ্য, মহাবিশ্বে আমাদের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে কোনো একপর্যায়ে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের মধ্যে অসমতা তৈরি হয়েছিল।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গে মিলতে পারে প্রমাণ
গবেষণাটির আরেক লেখক ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি কানপুরের ড. সুদীপ্ত শোর মতে, ভারী নিউট্রিনো কণাটির কারণে প্রাথমিক মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাসে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে থাকতে পারে।
এই পরিবর্তনের চিহ্ন আদিম মহাকর্ষীয় তরঙ্গে রয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ হলো স্থান ও কালের কাঠামোর মধ্যে সৃষ্টি হওয়া ঢেউ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা এসব তরঙ্গ তৈরি করেছিল। ফলে এসব তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বের শুরুর সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
গবেষকদের মতে, ভারী নিউট্রিনো কণাটির সাময়িক আধিপত্যের কারণে সৃষ্ট মহাবিশ্বের প্রসারণের পরিবর্তন আদিম মহাকর্ষীয় তরঙ্গে শনাক্তযোগ্য সংকেত রেখে যেতে পারে। ভবিষ্যতে এসব সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব হলে নতুন তত্ত্বটির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে গবেষণা
বিজ্ঞানীদের এই ব্যাখ্যা মহাবিশ্বের অস্তিত্বের অন্যতম বড় রহস্য সমাধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে গবেষণাটি এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে। ভারী নিউট্রিনো কণাটির ভূমিকা এবং এর মাধ্যমে পদার্থের আধিক্য তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা ও পরীক্ষামূলক প্রমাণ প্রয়োজন।
তবু কয়েক দশক ধরে উপেক্ষিত একটি কণা কীভাবে মহাবিশ্বে পদার্থের অস্তিত্ব টিকে থাকার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে, সেই সম্ভাবনা পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞানে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটন, সায়েন্সডেইলি ও ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স।/ এফএস