দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব বাড়ছে। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক দলে প্রবেশ ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থাও নেই।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার (১ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দলগুলোর গঠনতন্ত্রে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আয়-ব্যয়ের হিসাব, নিরীক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট নির্দেশনাও অনুপস্থিত। দেশের ১৬টি রাজনৈতিক দল নিয়মিত জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করে না। এর মধ্যে বিএনপি ১০ বছরের বেশি সময় ধরে জাতীয় সম্মেলন করেনি। দলগুলো বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না। তাদের আয়-ব্যয়ের বড় অংশই কর্মসূচিভিত্তিক এবং অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৮টি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে ন্যূনতম শুদ্ধাচার ও নৈতিকতার কোনো শর্ত উল্লেখ নেই। অপরাধীদের দলীয় সদস্যপদ বা গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণ ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থাও নেই। দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা, ব্যয় নির্বাহ, আধিপত্য বিস্তার এবং নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের মতো কারণে দলগুলো অর্থ ও পেশিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি আগ্রহী হয়। অন্যদিকে, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনকারী ও পেশিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা নিজেদের সুরক্ষা এবং সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে চাঁদাবাজি, মানবপাচার, চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের প্রবেশের ঘটনা লক্ষ্য করা যায়।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বিগত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১৮ থেকে ৩২ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এক বা একাধিক মামলা ছিল।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। কোনো দলেরই সুস্পষ্ট আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালি নেই। দলগুলো বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না। গঠনতন্ত্রে আয়-ব্যয়, সদস্যদের চাঁদার হার, অনুদান গ্রহণের শর্ত, লেনদেন, ফরম ফি, নিরীক্ষা ও আর্থিক জবাবদিহি-সংক্রান্ত নির্দেশনাও অস্পষ্ট।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান লঙ্ঘন করলেও দলগুলোর গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বিধান নেই। দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনি হলফনামায় সম্পদ, ঋণ, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও বিদেশি নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা কিংবা ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এছাড়া, দলগুলোর গঠনতন্ত্রে মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয়ের পরিকল্পনা, অর্থের উৎস, ব্যয় তদারকি এবং আর্থিক প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্ধারিত ব্যয়সীমার তুলনায় প্রার্থীরা গড়ে ১৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি ব্যয় করলেও দলগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকলেও দলগুলোর পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে লঘু দণ্ড দিয়েই দায় শেষ করা হয়। দলগুলোর তথ্যপ্রকাশের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৩২টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৪টির ওয়েবসাইট থাকলেও সক্রিয় রয়েছে মাত্র ১৬টির।
গবেষণার সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক চর্চা, অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি এবং অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় আইন ও বিধিমালা থাকলেও অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা এবং রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামোর অভাব রয়েছে। বিদ্যমান আইনি কাঠামোও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও অর্থ ব্যবস্থাপনার বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর। এমনটি জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ফলে, দলগুলোর আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিক উৎসের প্রাধান্য দলগুলোতে ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বিকাশে সহায়তা করছে।
বিশেষ করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও দলীয় অবস্থান ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হচ্ছে।
নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি সীমিত বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। আইনি বাধ্যবাধকতা ও দলীয় অঙ্গীকার থাকলেও নারীদের অন্তর্ভুক্তিতে দলগুলোর অনীহা রয়েছে বলে জানানো হয়। আরও বলা হয়, কোথাও কোথাও দলীয় কার্যক্রমে নারীদের উপস্থিতি নামমাত্র বা প্রতীকী।
টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দলীয় কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক চর্চা, তৃণমূলের অংশগ্রহণ ও নারী কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির ঘাটতির কারণে একক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, পরিবারতন্ত্র, কর্তৃত্বপরায়ণতা, অভিজাততন্ত্র ও পুরুষতান্ত্রিকতা আরও গভীর হচ্ছে।
গবেষণাটি গুণগত পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। এজন্য ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এর মধ্যে ৩৭টি নিবন্ধিত ও পাঁচটি অনিবন্ধিত দল। তথ্য পাওয়া গেছে ৩২টি দলের কাছ থেকে। বাকি ১০টি দলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা তথ্য দেননি।
গবেষণায় তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সময়ক্ষেপণ, অসহযোগিতা এবং আংশিক তথ্য দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের ইতিহাস ও অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন বড় অবদান রয়েছে, তেমনি গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের দায়ও তাদের রয়েছে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে না, যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে সুশাসন নিশ্চিত না হয়। আমরা সাধারণত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের কথা বলি, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিষয়টি অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। অথচ, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও তাদের ওপর মানুষের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে এ গবেষণা করা হয়েছে। ২০২৩ সালের জুনে গবেষণার কাজ শুরু হলেও দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন দলের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতার চ্যালেঞ্জসহ নানা কারণে প্রতিবেদনটি সম্পন্ন করতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় লেগেছে।
এসএ