উৎসবের ছুটিতে শহর কিছুটা ফাঁকা হলেও পুরান ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোতে কেনাকাটার আমেজ এখন ফিকে হয়ে গেছে অতিরিক্ত দামের ধাক্কায়। ডিম আর ব্রয়লারের দামে সামান্য ছাড় মিললেও শাকসবজি ও মাছ-মাংসের অগ্নিমূল্যের সামনে অসহায় ক্রেতারা। বাজার সদাই শেষে থলি ভরে বাড়ি ফেরার বদলে এখন এক পদের তরকারি নিয়েই দিন কাটানোর করুণ চিত্র ফুটে উঠছে মধ্যবিত্তের সংসারে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার ও নয়াবাজার, কাপ্তানবাজার ঘুরে দেখা যায়, গত সপ্তাহের তুলনায় ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা কমলেও চালের বাজার অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে সবজি ও মাছ-মাংসের চড়া দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। ফলে বাধ্য হয়ে যেকোনো এক পদের তরকারি কিনে বাড়ি ফিরছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা।
বাজারে ফুলকপি, ঝিঙা, লাউ, কচুমুখি ও পটল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। বেগুন ও কাঁকরোলের কেজি ১০০ টাকা। শীতের আগাম জাতের মুলা ও ঢ্যাঁড়স বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে। আর নতুন শীতের শিম কিনতে গুণতে হচ্ছে কেজিতে ১৬০ টাকা! এছাড়া নতুন আলু ১৪০ টাকা এবং প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়।
বিক্রেতারা বলছেন, পূজার ছুটিতে বেচাকেনা কিছুটা কম হলেও আড়ত থেকে বেশি দামে কেনায় ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। রায়হান উদ্দিন নামের এক বিক্রেতা বলেন, “বাজারে এসে মানুষ মাছ-মাংস না কিনলেও অন্তত শাকসবজি কিনে নেয়। তবে সবকিছুর দামই চড়া। আমরা কম দামে কিনতে পারলে কমেই বিক্রি করব।”
কাপ্তানবাজারে বাজার করতে আসা আলম হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “পরিবার নিয়ে টিকে থাকতে বেতনের অর্ধেকই চলে যায় বাসা ভাড়ায়। বাকি টাকায় বাজার-সদাই, সন্তানের পড়াশোনা আর অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা চালাতে হয়। আমাদের জীবন এখন এক তরকারিতেই সীমাবদ্ধ, একাধিক কেনার সামর্থ্য নেই। বাচ্চাদের চাহিদা মেটাতে গেলেই সংসারে টানাপোড়েন শুরু হয়। তার ওপর ঠিকমতো গ্যাস না পেয়ে বাড়তি সিলিন্ডারের খরচ তো আছেই।”
সবজির বাজার সেরে অধিকাংশ ক্রেতাকেই মাছ-মাংসের দোকান এড়িয়ে চলে যেতে দেখা যায়। আবদুল হামিদ নামের এক ক্রেতা বলেন, “আমাদের মতো আয়ের মানুষের একমাত্র ভরসা তেলাপিয়া বা পাঙাশ, সেগুলোর কেজিও এখন প্রায় ৩০০ টাকা। অন্য মাছ বা মাংসের দাম শুনে তো লাভ নেই, তাই ওদিকে উঁকি দেওয়ারও সাহস পাই না।”
আজকের বাজারে আকারভেদে রুই মাছ ৩৫০-৬০০ টাকা এবং কাতল ৪০০-৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কালিবাউশ ৫০০-৮০০, চিংড়ি ৮০০-১৬০০, পাবদা ৪০০-৬০০, টেংরা ৬০০-১০০০ এবং বোয়াল ৬০০-১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে, ব্রয়লার মুরগি ১৭৫-১৮৫ টাকা ও দেশি মুরগি ৬৫০ টাকায় বিক্রি হলেও গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১,২৫০ টাকা কেজিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৩৫ টাকায়।
মুদি পণ্যের বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্যাকেটজাত পোলাওয়ের চাল ২৩০০ টাকা ও খোলা পোলাওয়ের চাল ১৬০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চালের বাজার আগের মতোই স্থির। ছোট মসুর ডাল ১৪০-১৫০ টাকা, মোটা মসুর ৯০ টাকা, ছোলার ডাল ১০৫ টাকা ও মাষকলাইয়ের ডাল ১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০৫ টাকা এবং খোলা চিনি ১১০ টাকা।
নিত্যপণ্যের এই দাম নিয়ে নার্গিস সুলাতনা নামের এক ক্রেতা আফসোস করে বলেন, “আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, কোনো সরকারি ত্রাণ বা কার্ড আমাদের কপালে জোটে না। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেন সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আনা হয়।”
এসএ