দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দিতে বগুড়ার শেরপুরে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল চারতলা ট্রমা সেন্টার। ২০১৯ সালে নির্মাণকাজ শেষ করে ভবনটি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরও করা হয়। কিন্তু সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানে শুরু হয়নি ট্রমা রোগীদের ভর্তি ও জরুরি চিকিৎসাসেবা। দুর্ঘটনাপ্রবণ ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের পাশে নির্মিত ভবনটি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে প্রশাসনিক কাজ ও বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবায়।
শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া রিজিয়নের মধ্যে এই অংশের মহাসড়কটি সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ। শাজাহানপুরের বনানী বাইপাস থেকে চান্দাইকোনা পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার সড়ক অংশে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৬৬টি গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৫৫ জন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অনেক রোগীকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। শেরপুরে পূর্ণাঙ্গ ট্রমা চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় গুরুতর আহত রোগীদের প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরের ওই হাসপাতালে নিতে হয়। দুর্ঘটনার পর দ্রুত অস্ত্রোপচার, রক্তের ব্যবস্থা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন এমন রোগীদের ক্ষেত্রে এই দূরত্বই জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভেতরে ট্রমা সেন্টার স্থাপনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল।
প্রকল্প অনুযায়ী, ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টারে সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ও দুজন রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসারসহ ১৪ জন চিকিৎসক এবং ১০ জন নার্স থাকার কথা। এ ছাড়া ফার্মাসিস্ট, রেডিওলজি ও ল্যাব টেকনিশিয়ান, চালক, অফিস সহকারী, ওয়ার্ডবয় ও আয়ার মতো বিভিন্ন পদে আরও জনবলসহ মোট ৬০ জন কর্মীর ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল।
এ জন্য ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালে চারতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ না করায় সাত বছরেও ট্রমা সেন্টারটি চালু হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য নির্মিত ভবনটিতে এখন শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগের কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি সেখানে প্রশাসনিক কাজও করা হচ্ছে।
শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, ট্রমা ইউনিট চালু না হওয়ায় ভবনটি বিকল্পভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে ভবন নির্মাণের পর ট্রমা সেন্টারের জন্য নির্ধারিত পদগুলোতে জনবল নিয়োগ না হওয়ায় এটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি তার মূল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বগুড়া জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক জানে আলম খোকা বলেন, ট্রমা সেন্টারটি চালু না হওয়ায় শ্রমিকদের পাশাপাশি দুর্ঘটনাকবলিত মানুষও দ্রুত উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে কেউ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছেন, আবার অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। এত টাকা ব্যয়ে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প এভাবে পড়ে থাকা উচিত নয়। বিষয়টি সংসদ সদস্যকে জানানো হয়েছে। তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
বগুড়া জেলার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফারজানুল ইসলাম বলেন, শেরপুরের ওই অঞ্চলটি দুর্ঘটনাপ্রবণ। মহাসড়কে দুর্ঘটনাকবলিত রোগীকে বগুড়ায় পাঠাতে সময় লাগায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে শেরপুরের ট্রমা সেন্টারটি চালু করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর ট্রমা সেন্টারটি পরিদর্শন করেন। তবে এখন পর্যন্ত পরবর্তী কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
সৌরভ অধিকারী শুভ / এফএস