ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
ফিরে দেখা
৯/১১: যে সকালে বদলে গিয়েছিল বিশ্ব
চার বিমান ছিনতাই, টুইন টাওয়ারে হামলা, পেন্টাগনে আগুন—এক ভয়াবহ সকাল বদলে দেয় বিশ্বরাজনীতির গতিপথ
✎ অবজারভার প্রতিবেদক
⏲ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪১ এএম
X
Advertisement

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। মঙ্গলবার, প্রাত্যহিক সেই সকালটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল আর দশটি দিনের মতোই স্বাভাবিক। আকাশ পরিষ্কার, কর্মমুখী মানুষের তাড়া, আর আকাশপথে নির্ধারিত গন্তব্যে উড্ডয়ন করছিল যাত্রীবাহী বিমানগুলো। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই শান্ত সকাল পরিণত হয় আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায়।

নিউইয়র্কের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী, ম্যানহাটনের বুকে ধসে পড়া টুইন টাওয়ার, ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগনে আগুন এবং পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত বিমান—১১ সেপ্টেম্বরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই তাণ্ডব স্থবির করে দেয় যুক্তরাষ্ট্রকে, যার ভূরাজনৈতিক অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বে।

জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৯ জন সন্ত্রাসী চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। দুটি বিমান আঘাত হানে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে এবং একটি পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি যাত্রীদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের মুখে পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।

শুরুটা যেভাবে

সেদিন সকালে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল থেকে ক্যালিফোর্নিয়াগামী চারটি বাণিজ্যিক বিমান উড্ডয়ন করে। বিমানগুলো ছিল—আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১১, ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১৭৫, আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৭৭ এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৯৩।

উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় ছিনতাইকারীরা।

প্রথম বিমান ‘আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১১’ সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারের ৯৩ থেকে ৯৯ তলার অংশে সজোরে আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যে ভবনের ওপরের অংশে আগুন ধরে যায় এবং ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ।

প্রথম আঘাতের পর মুহূর্তেই পুরো পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং এটি যে একটি সমন্বিত হামলার অংশ, তা অনেকেই আঁচ করতে পারেননি।

দ্বিতীয় বিমান, দ্বিতীয় আঘাত

প্রথম হামলার মাত্র ১৭ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৩ মিনিটে দ্বিতীয় বিমান ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১৭৫’ আঘাত হানে ট্রেড সেন্টারের দক্ষিণ টাওয়ারে।

সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচারে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করে দ্বিতীয় বিমানটি ভবনে আছড়ে পড়ার দৃশ্য। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, নিউইয়র্কে যা ঘটছে তা কোনো দুর্ঘটনা নয়—বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা।

পরপর দুটি টাওয়ারে বিমান হামলার পর আকাশচুম্বী ভবন দুটিতে হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়েন। নিচে শুরু হয় আতঙ্কিত মানুষের দিকবিদিক ছোটাছুটি। জীবন বাজি রেখে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন পুলিশ, দমকলকর্মী ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা।

পেন্টাগনে আঘাত

নিউইয়র্কে যখন উদ্ধার তৎপরতা ও হাহাকার চলছে, তখন আরেকটি বিমান ধেয়ে যাচ্ছিল দেশটির রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির দিকে।

সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে ‘আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৭৭’ আছড়ে পড়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগনে। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক পরাশক্তির প্রতীক পেন্টাগনও সেদিন রূপ নেয় এক বিধ্বস্ত ও অগ্নিকুণ্ডলীতে।

টুইন টাওয়ারের পতন

নিউইয়র্কের পরিস্থিতি তখন চরম ভয়াবহ। টাওয়ার দুটির ভেতরে আটকে পড়া মানুষ নিচে নামার আকুল চেষ্টা করছেন, আর বাইরে থেকে উদ্ধারকারীরা ওপরে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

তবে বিমান থেকে নির্গত জ্বালানির তীব্র আগুন ও কাঠামোগত ক্ষতির কারণে স্থায়িত্ব হারায় ভবন দুটি। সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে চোখের সামনে ধসে পড়ে দক্ষিণ টাওয়ারটি। এর মাত্র ২৯ মিনিট পর, সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে উত্তর টাওয়ারটিও একইভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপত্যচিহ্ন পরিণত হয় এক বিজন ধ্বংসস্তূপে। ধুলো, ধোঁয়া ও কঙ্কালসার ধ্বংসাবশেষে ঢেকে যায় পুরো নিম্ন ম্যানহাটন।

চতুর্থ বিমান ও যাত্রীদের প্রতিরোধ

চতুর্থ বিমানটি ছিল ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৯৩’।

অন্য তিনটি বিমানে হামলার খবর ততক্ষণে এই বিমানের যাত্রীরা জেনে গিয়েছিলেন। তারা বুঝতে পারেন, তাদের বিমানটিকেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। যাত্রীদের এই সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধের মুখে সকাল ১০টা ৩ মিনিটে বিমানটি পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের এক পরিত্যক্ত কয়লাখনি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। ফলে বিমানটি মূল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়।

ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রী ও ক্রুদের এই অভূতপূর্ব প্রতিরোধ ৯/১১-এর ইতিহাসে অসীম সাহসিকতার প্রতীক হয়ে আছে।

হতাহতের সংখ্যা

৯/১১-এর ভয়াবহ হামলায় ১৯ জন ছিনতাইকারী ব্যতীত মোট ২,৯৭৭ জন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বিমানের যাত্রী ও ক্রু, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেন্টাগনের কর্মী এবং উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া বহু জরুরি সেবা কর্মী।

বিশ্বের প্রায় ৯৩টি দেশের নাগরিক এই হামলায় জীবন হারান বা ক্ষতিগ্রস্ত হন, যা একে একটি বৈশ্বিক ট্র্যাজেডিতে রূপ দেয়।

তবে ট্র্যাজেডির শেষ সেখানেই ছিল না।

হামলার পরবর্তী সময়ে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া হাজার হাজার দমকলকর্মী, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিষাক্ত ধুলো ও কেমিক্যালের সংস্পর্শে এসে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। পরবর্তী বছরগুলোতে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও অনেকে। পরবর্তীতে তাদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা ও ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করা হয়।

হামলার পেছনে কারা ছিল?

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (FBI)-এর তদন্ত অনুযায়ী, এই বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে আল-কায়েদার ১৯ জন জঙ্গি সরাসরি জড়িত ছিল।

সংগঠনটির তৎকালীন প্রধান ওসামা বিন লাদেন ছিলেন এই হামলার মূল নির্দেশক ও পরিকল্পনাকারী। এফবিআই পরবর্তীতে তাকেই ৯/১১ হামলার প্রধান মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত করে।

বদলে যাওয়া আমেরিকা, বদলে যাওয়া বিশ্ব

৯/১১-এর পর আমেরিকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং বৈশ্বিক নজরদারি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়।

এর সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক প্রভাব পড়ে আফগানিস্তানে আমেরিকার সামরিক অভিযানের মাধ্যমে। পরবর্তীতে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ (War on Terror) ছড়িয়ে পড়ে ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের টানাপোড়েন এক নতুন মাত্রা পায়।

সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে সামরিক আগ্রাসন, সার্বক্ষণিক নজরদারি আইন এবং যুদ্ধের বিপুল মানবিক ক্ষতি নিয়ে পরবর্তী দুই দশকজুড়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

৯/১১ শুধু একটি ইতিহাস নয়

আজ দীর্ঘ ২৫ বছর পরও ৯/১১ কেবল ইতিহাসের কোনো বাঁধাধরা তারিখ নয়।

এটি হাজার হাজার পরিবারের স্বজন হারানোর কান্না, শেষ মুহূর্তে প্রিয়জনের কাছে আসা শেষ ফোনকলের আকুতি, আগুনের মধ্যে আটকে পড়া মানুষের হাহাকার এবং অন্যদের বাঁচাতে জীবন দেওয়া দমকল ও পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগের এক বেদনাবিধুর ইতিহাস। এটি একই সঙ্গে সেই বীর যাত্রীদের গল্প, যারা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

নিউইয়র্কের ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে আজ গড়ে উঠেছে স্মৃতিনিদর্শন (9/11 Memorial & Museum), যেখানে ব্রোঞ্জের ফলকে খোদাই করা আছে নিহত প্রতিটা মানুষের নাম। এটি নতুন প্রজন্মকে সেই দিনের ইতিহাস এবং তার শিক্ষা মনে করিয়ে দেয়।

যে সকালের শেষ হয়নি

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালটি সাধারণভাবেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আমেরিকার আকাশে যুদ্ধবিমান, নিউইয়র্কের বুকে ধসে পড়া টাওয়ার আর লাখ লাখ মানুষের অশ্রুসজল চোখে বদলে যায় ইতিহাসের গতিপথ।

তিন হাজার মানুষের প্রাণহানির চেয়েও এই ঘটনার সার্বিক অভিঘাত ছিল অনেক বেশি গভীরে। বিমান চলাচল পদ্ধতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যুদ্ধনীতি এবং বিশ্বরাজনীতির চিরচেনা সমীকরণকে বদলে দিয়েছে এই একটি মাত্র দিন।

কোয়ার্টার সেঞ্চুরি পার করেও ১১ সেপ্টেম্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সন্ত্রাসবাদ শুধু ইট-কাঠের অট্টালিকা ধ্বংস করে না; তার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয় মানবজাতি, সমাজ ও আগামীর প্রজন্মকে।
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement