একটি সকাল। চারটি বিমান। দুটি আকাশচুম্বী ভবন। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বদলে যাওয়া একটি বিশ্ব। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালটা নিউইয়র্কে অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। মানুষ কাজে যাচ্ছিল, অফিস খুলছিল, ব্যস্ত মহানগর ছুটছিল তার স্বাভাবিক গতিতে। ম্যানহাটনের আকাশে দাঁড়িয়ে ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুই বিশাল টাওয়ার।বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম পরিচিত প্রতীক।
কেউ তখনও জানত না, কয়েক মিনিটের মধ্যে এই ভবন দুটিই পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত সন্ত্রাসী হামলার কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
সেদিন যুক্তরাষ্ট্রে চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করা হয়। এর মধ্যে দুটি নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার -এর দুই টাওয়ারে আঘাত হানে, একটি আঘাত করে ওয়াশিংটনের পেন্টাগন -এ। চতুর্থ বিমানটি যাত্রীদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলে বিধ্বস্ত হয়। হামলায় প্রাণ হারান ২,৯৭৭ জন। কিন্তু ৯/১১-এর গল্প শুরু হয়েছিল ওই সকাল থেকে নয়।এর শিকড় ছিল আরও বহু বছর আগে।
আফগান যুদ্ধের পটভূমিতে গড়ে ওঠা আল-কায়েদা নব্বইয়ের দশকে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কে পরিণত হয়। এর অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন সৌদি বংশোদ্ভূত ওসামা বিন লাদেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থান ক্রমেই কঠোর হতে থাকে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বড় আকারের হামলার পরিকল্পনায় এগোয়।
এর আগেও সংগঠনটির হামলার নজির ছিল। ১৯৯৮ সালে কেনিয়া ও তানজানিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলা এবং ২০০০ সালে ইউএসএস কোল-এ হামলা দেখিয়ে দিয়েছিল।এটি আর কোনো বিচ্ছিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী নয়।
পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন খালিদ শেখ মোহাম্মদ। ৯/১১ কমিশন-এর তদন্ত অনুযায়ী, ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে তার প্রস্তাবিত বিমান ব্যবহার করে হামলার পরিকল্পনা আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদন পায়। এরপর ধীরে ধীরে তৈরি হয় সেই অপারেশনের কাঠামো।
পরিকল্পনার জন্য নির্বাচিত ১৯ জন অপারেটিভের মধ্যে চারজনের দায়িত্ব ছিল বিমান নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
তারা যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকে বিভিন্ন সময়ে। কেউ বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নেয়, কেউ অবস্থান তৈরি করে, কেউ যোগাযোগ ও অর্থের ব্যবস্থা করে। বাইরে থেকে তাদের অনেকের জীবন ছিল সাধারণ মানুষের মতোই।
কারণ হামলাকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে বিমান চালনা শেখার সুযোগ পেয়েছিল, বিভিন্ন শহরে অবস্থান করেছিল এবং নিজেদের পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছিল।অথচ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে থাকা বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ সতর্কবার্তায় পরিণত হয়নি।
৯/১১ কমিশনে-এর তদন্তে দেখা যায়, ২০০১ সালের গ্রীষ্মে আল-কায়েদা নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছিল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের হামলার সম্ভাবনা নিয়ে তথ্য ছিল।
পরে কমিশনের তদন্তে এই ব্যর্থতাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়: বিভিন্ন সংস্থা যখন আলাদা আলাদা সতর্ক সংকেত পাচ্ছিল, তখন কেন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র বিপদের মাত্রা বুঝতে পারল না?
৯/১১ কমিশন পরে গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থার মধ্যে তথ্য ভাগাভাগি এবং সমন্বয়ের দুর্বলতাকে বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করে।
১১ সেপ্টেম্বরের সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটের দিকে আমেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১১ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার -এর নর্থ টাওয়ারে আঘাত করে।
প্রথম মুহূর্তে অনেকে এটিকে দুর্ঘটনা মনে করেছিলেন।
কিন্তু প্রায় ১৭ মিনিট পর, ৯টা ৩ মিনিটে, ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১৭৫ সাউথ টাওয়ারে আঘাত করে।
টেলিভিশনের ক্যামেরায় সরাসরি সম্প্রচারিত হতে থাকে ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া আকাশচুম্বী ভবন। কয়েক মিনিটের মধ্যে নিউইয়র্কের দৃশ্যটি সারা পৃথিবীর মানুষের চোখের সামনে চলে আসে।
বিমান দুটি ভবনের উচ্চতর অংশে আঘাত করেছিল। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, সিঁড়ি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নিচের তলাগুলো থেকে হাজার হাজার মানুষ বের হওয়ার চেষ্টা শুরু করেন।
অন্যদিকে পুলিশ, দমকলকর্মী, চিকিৎসাকর্মী ও জরুরি সেবার কর্মীরা উল্টো দিকে ছুটছিলেন।মানুষকে বের করে আনতে তারা ভবনের ভেতরে ঢুকছিলেন।
৫৬ মিনিট পর ধসে পড়ল সাউথ টাওয়ার।
দ্বিতীয় বিমান আঘাত করার পরও সাউথ টাওয়ার কিছু সময় দাঁড়িয়ে ছিল। প্রায় ৯টা ৫৮ মিনিটে সেটি ধসে পড়ে। এরপর উত্তর টাওয়ারও ধসে পড়ে প্রায় ১০টা ২৮ মিনিটে।
বিশাল ভবন দুটি ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যানহাটনের ওপর নেমে আসে ধুলা, ধোঁয়া ও ধ্বংসস্তূপের বিশাল মেঘ।
এনআইএসটি-এর দীর্ঘ প্রকৌশলগত তদন্তে বলা হয়, বিমান আঘাতে কাঠামোগত ক্ষতি, আগুনে স্টিলের অবকাঠামো দুর্বল হয়ে যাওয়া এ তদন্তের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ায়। একই সঙ্গে নাগরিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে শুরু হয় দীর্ঘ বিতর্ক।
এরপর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এক্ট ২০০২-এর মাধ্যমে ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি গঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বহু নিরাপত্তা সংস্থাকে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকাতে সমন্বয় বাড়ানো।
নিউইয়র্ক থেকে আফগানিস্তান
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল।আল-কায়েদা আফগানিস্তানে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে এবং তালেবান সরকার তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি।
৭ অক্টোবর ২০০১ যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে।
এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় এমন এক যুদ্ধ, যা শেষ হতে দুই দশক লেগে যাবে।
তালেবান সরকার দ্রুত ক্ষমতা হারালেও আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্ব পুরোপুরি ধরা পড়েনি।
বিন লাদেনও পালিয়ে যান।
এক দশক পর শেষ হলো অনুসন্ধান
বছরের পর বছর ধরে চলা অনুসন্ধানের পর ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিন লাদেনের অবস্থান শনাক্ত করে।
২ মে ২০১১, পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হন।
কিন্তু তার মৃত্যু ৯/১১-এর গল্পের সমাপ্তি ঘটায়নি।
কারণ এর মধ্যে আফগানিস্তান যুদ্ধ দীর্ঘ হয়েছে, ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়েছে, বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী নীতি বদলেছে এবং কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তাবোধও পাল্টে গেছে।
ইরাক ৯/১১-এর সঙ্গে যার সম্পর্ক নিয়ে বড় ভুল ধারণা আছে।
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকেও সামরিক অভিযান চালায়। কিন্তু ৯/১১ কমিশন-এর তদন্তে সাদ্দাম হোসাইন-এর সরকার এবং ৯/১১ হামলার মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ আফগানিস্তানে আল-কায়েদাকে লক্ষ্য করে অভিযান এবং পরবর্তী ইরাক যুদ্ধকে একই ঘটনার সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।
হামলার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল।
এত শক্তিশালী গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র কেন প্রস্তুত ছিল না?
তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে নানা স্তরের ব্যর্থতা।তথ্য ভাগাভাগির সমস্যা, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, পুরোনো নিরাপত্তা ধারণা এবং নতুন ধরনের সন্ত্রাসী হুমকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব।
কমিশনের সুপারিশের কেন্দ্রীয় ধারণা ছিল একটি।রাষ্ট্রের বিভিন্ন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে আলাদা আলাদা দ্বীপ হিসেবে কাজ করলে চলবে না।
তথ্য থাকতে হবে, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই তথ্যকে সময়মতো সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া।
একটি হামলা, যার ছায়া দুই দশক পেরিয়েও রয়ে গেছে
৯/১১-এর পর পৃথিবী আর আগের জায়গায় থাকেনি।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বদলেছে।
সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বদলেছে।
গোয়েন্দা সহযোগিতা বদলেছে।
সন্ত্রাসী অর্থায়ন ঠেকাতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কঠোর হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নতুন শব্দ পেয়েছে 'ওয়ার অন টেরর'।
আফগানিস্তানে শুরু হয়েছে দীর্ঘ যুদ্ধ। পরে ইরাকেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মুসলিম ও আরব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রাফাইলিং ও বৈষম্য নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নাগরিক স্বাধীনতা বনাম জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও নতুন মাত্রা পেয়েছে।
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এর সকালকে শুধু কয়েকটি বিমানের ছিনতাই হিসেবে দেখলে ঘটনাটির গভীরতা বোঝা যায় না।
এটি ছিল বহু বছরের একটি জঙ্গি পরিকল্পনার চূড়ান্ত প্রকাশ।
এটি ছিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিচ্ছিন্ন তথ্য একত্র করতে ব্যর্থ হওয়ার গল্প।
এটি ছিল হাজার হাজার মানুষের বাঁচার জন্য ছুটে চলার গল্প।
এটি ছিল দমকলকর্মী, পুলিশ, চিকিৎসাকর্মী ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের গল্প।
এটি ছিল একটি দেশের নিরাপত্তা দর্শন বদলে যাওয়ার মুহূর্ত।
এবং একই সঙ্গে এটি ছিল এমন এক যুদ্ধের সূচনা, যার রাজনৈতিক ও মানবিক প্রভাব আজও শেষ হয়নি।
সেদিন নিউইয়র্কের আকাশ থেকে দুটি টাওয়ার হারিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু ৯/১১-এর ধাক্কা থেমে থাকেনি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে।
তার অভিঘাত পৌঁছেছে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী কক্ষে, কাবুলের যুদ্ধক্ষেত্রে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা লাইনে, গোয়েন্দা সংস্থার নীতিতে এবং বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের নিরাপত্তাবোধে।
এফএস