টানা বৃষ্টি, খামারে উৎপাদন ঘাটতি আর পরিবহন সংকটের অজুহাতে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে ফের তীব্র আগুন লেগেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে কেবল শাকসবজিই নয়, চাল ও ডালের পর এবার সাধারণ মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস ডিম, মুরগি ও মাছের দামও পৌঁছে গেছে নাগালের বাইরে। বিগত ছয় মাসের ব্যবধানে প্রায় প্রতিটি জরুরি নিত্যপণ্যের দর কয়েক দফায় বৃদ্ধিতে বাজারের ব্যাগ হাতে চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। সীমিত আয়ের বাজেট দিয়ে সংসারের প্রতিদিনের কেনাকাটা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিরপুর-৬, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মালিবাগ, সেগুনবাগিচা, কাপ্তানবাজার ও রামপুরাসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের এই লাগামহীন চড়া দাম ও ক্রেতাদের হাহাকারের চিত্র দেখা গেছে।
কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীমুখী সবজিবাহী পরিবহনের স্বাভাবিক সরবরাহ অনেকটাই ব্যাহত হয়েছে। ফলে পাইকারি থেকে খুচরা—সব বাজারেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় প্রতিটি সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
সবজির বাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে নিত্যদিনের চাহিদায় থাকা বেগুনে। মানভেদে গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৪০ টাকা পর্যন্ত, যা গত সপ্তাহেও ছিল ১০০ টাকার নিচে। অন্যদিকে লম্বা বেগুনের দাম ঠেকেছে ১০০ টাকায়। এ ছাড়া বরবটি ১২০ টাকা, গাজর ১৪০ টাকা, শসা ৮০ টাকা এবং ঝিঙা, ধন্দুল, চিচিঙ্গা, পটল ও করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে।
রান্নার অন্যতম অনুষঙ্গ কাঁচামরিচের ঝালও আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়েছে; গত সপ্তাহে যে কাঁচামরিচ ১২০ টাকায় কেনা গেছে, তা আজ বিকোচ্ছে ১৬০ টাকায়। সালাদের টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪০ টাকায়, অথচ কয়েক মাস আগেই এর দর ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে।
বর্তমানে পুরো বাজারে একমাত্র পেঁপে ছাড়া অন্য কোনো সবজি সাধারণ মানুষের বাজেটের মধ্যে নেই। বাজারে প্রতি কেজি পেঁপে মিলছে ৩০ টাকায়, আর কাঁচাকলার হালি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়।
কাপ্তানবাজারে সাপ্তাহিক কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী নাদিম হাসান তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘গত সপ্তাহেও দরদাম কিছুটা সহনীয় ছিল। কিন্তু আজ বাজারে এসে দেখছি সবজির দাম হুট করে অনেক বেড়ে গেছে। মাস শেষে যা আয় করি, তার পুরোটাই যদি চাল আর সবজি কিনতেই চলে যায়, তবে অন্যান্য খরচ সামলে পরিবার নিয়ে চলব কীভাবে?’
একই চিত্র দেখা গেছে কাওরান বাজারেও। শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা বদরুল হাসান বলেন, ‘টমেটো আর বেগুনের দাম এতটা বেড়ে যাবে তা ভাবিনি। আগে যে টাকা নিয়ে বাজারে এলে কয়েক পদের সবজি কেনা যেত, এখন একই টাকায় অর্ধেকের কম জিনিস মিলছে। বাধ্য হয়ে কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছি।’
সবজির চড়া বাজারের সঙ্গে সমান তালে যোগ হয়েছে ডিম ও মুরগির বাজার। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চড়া দামে বিক্রি হওয়া ফার্মের ডিমের দাম আরেক ধাপ বেড়ে এখন ডজনপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে, যা এক মাস আগেও ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা।
অন্যদিকে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের আমিষের চাহিদা মেটানোর শেষ ভরসা হিসেবে পরিচিত ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। আগে যা ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। মাঝারি ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পছন্দের সোনালি মুরগি কিনতে এখন কেজিতে খসাতে হচ্ছে ৩১৪ থেকে ৩৬০ টাকা। এ ছাড়া হাইব্রিড সোনালি বা কালারবার্ড মুরগি বাজারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকা কেজিতে।
গরুর মাংস ও খাসির মাংস আগেই সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। ফলে যে সব পরিবার আমিষের যোগান দিতে মাছের দিকে ঝুঁকছেন, সেখানেও কোনো স্বস্তি মিলছে না। গরিবের মাছ হিসেবে পরিচিত তেলাপিয়া ও পাঙাশের দাম চলতি বছরের মার্চ মাসের তুলনায় কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বর্তমানে প্রতি কেজি তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে (যা মার্চে ছিল যথাক্রমে ২০০-২৩০ টাকা ও ১৮০-২২০ টাকা)। এ ছাড়া মাঝারি ও সাধারণ মানের রুই-কাতলা মাছের কেজি হাঁকা হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, আর বড় আকারের রুই-কাতলা বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়।
সবজি, মাছ ও মাংসের দরবৃদ্ধির পাশাপাশি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে গত ২ সেপ্টেম্বর ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এক মাস আগের তুলনায় বেড়ে খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকায় এবং মোড়কজাত চিনি মিলছে ১২০ টাকা কেজি দরে। ফলে রান্নার প্রধান এই মৌলিক উপকরণগুলো কিনতে গিয়েই পকেটের বড় অংশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ক্রেতাদের।
বাজারের এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কাপ্তানবাজার, কাওরান বাজার ও রামপুরা এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, টানা বৃষ্টির কারণে মাঠ পর্যায়ে কৃষক পর্যায়ে সবজি নষ্ট হওয়া এবং পরিবহন সংকটের কারণে পাইকারি বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ আসছে না।
মিরপুর-৬ নম্বর বাজারের সবজি বিক্রেতা সোহেল মিয়া জানান, কয়েক মাস আগে বাজারে সবজির জোগান বেশি থাকায় দাম নাগালের মধ্যে ছিল। কিন্তু এখন পাইকারি বাজারেই আমাদের বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। পাইকারিতে দাম না কমলে খুচরায় কমানোর কোনো সুযোগ নেই। তবে বৃষ্টি কমে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দাম আবার নেমে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।
এদিকে ডিম ও মুরগির দাম বৃদ্ধি নিয়ে খামারি ও বিক্রেতাদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে খামারে মুরগির উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পোল্ট্রি ফিডের চড়া দামের কারণে সরবরাহে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তবে বাজার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও ভুক্তভোগী সাধারণ ক্রেতাদের মতে, কেবল প্রাকৃতিক কারণ বা উৎপাদনের ঘাটতি নয়; বাজারে যথাযথ তদারকির অভাব এবং অসাধু সিন্ডিকেটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করাও এই লাগামহীন দরবৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সঙ্গতি রাখতে না পেরে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলো এখন খাদ্যতালিকা থেকে কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের পুষ্টি নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এসএ