খুলনার রায়েরমহল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র মো. রিহাদ হোসেন হত্যা মামলায় চার আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডসহ চারটি ধারায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পৃথক দুটি ধারায়ও তাদের জরিমানা করা হয়। এছাড়া এ মামলার অপর এক আসামিকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বুধবার দুপুরে খুলনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক নাজমুস শাহাদাত এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই আদালতের বেঞ্চ সহকারী নজরুল ইসলাম।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—রাজু শেখ ওরফে গাংগুয়া, শামীম ওরফে সবুজ মোড়ল, নুর আলম সিদ্দিক ওরফে কলিন্স ওরফে বাদশা এবং জয়ন্ত। অপর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন আবুল কালাম আজাদ।
আদালত সূত্রে জানা যায়, মো. রিহাদ হোসেন নগরের রায়েরমহল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিল। ২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে সে বাড়ি থেকে বাবার ইজিবাইক চালিয়ে যাত্রী পরিবহনের জন্য মোস্তফার মোড়ে যায়।
সেখানে যাওয়ার পর কয়েকজন যাত্রী তার ইজিবাইকটি ভাড়া করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। ওই দিন থেকেই রিহাদ হোসেন নিখোঁজ ছিল। নিখোঁজ হওয়ার আগে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন দিয়ে রিহাদ গ্যারেজ মালিককে জানায়, তার ফিরতে দেরি হবে। বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ায় গ্যারেজ মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও পরে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
খোঁজ না পেয়ে নিহতের প্রতিবেশী চাচা মো. ইমরান শেখ আড়ংঘাটা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
সূত্র আরও জানায়, ৯ ডিসেম্বর বিকেলে ডুমুরিয়ার পঞ্চু খাল থেকে অজ্ঞাতনামা একটি মরদেহ উদ্ধারের খবর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ সংবাদ পেয়ে পরিবারের সদস্যরা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে রিহাদের মরদেহ শনাক্ত করেন। তার গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় নিহতের চাচা শেখ জাহাঙ্গীর বাদী হয়ে ডুমুরিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
সূত্র জানায়, ৬ ডিসেম্বর বিকেল ৪টার দিকে জয়ন্ত, ফয়জুল, কলিন্স ও বড় শামীম, শাওন ও জাহিদের পরামর্শে মোবাইল ফোনে রিহাদ হোসেনকে ভাড়ায় যাওয়ার কথা বলে রায়েরমহল বাজারে ডেকে আনা হয়। এ সময় জয়ন্ত তার মামার বাড়ি যাওয়ার কথা বলে ওই ইজিবাইকে ওঠে। জয়ন্ত, শামীম, কলিন্স ও ফয়জুল রায়েরমহল বাজারের এখলাসের দোকান থেকে পান-সিগারেট কিনে প্রথমে খালিশপুর নিউ মার্কেট এলাকায় যায়। পরে সেখান থেকে ডুমুরিয়ার শলুয়া বাজারে যায়।
সেখানে নজরুল স্টোর থেকে আবার পান-সিগারেট কিনে তারা দক্ষিণ দিকে কাঁচা রাস্তার দিকে যায়। অন্ধকার ঘনিয়ে এলে নির্জন স্থানে পৌঁছে ইজিবাইক থামাতে বলে। ইজিবাইক থামানোর পরপরই ফয়জুল আলম রিহাদের মুখ চেপে ধরে। রিহাদ চিৎকার করলে জয়ন্ত তার মুখ চেপে ধরে এবং ভিকটিম তার হাতে কামড় দেয়। তখন রাজু হাতুড়ি দিয়ে রিহাদের মাথায় আঘাত করলে গুরুতর জখম হয়।
এরপর জয়ন্তের নির্দেশে অপর আসামি নুর আলম কলিন্স ব্লেড দিয়ে রিহাদের গলায় আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে মরদেহ পঞ্চু খালে ফেলে দেয়। এরপর আসামিরা ইজিবাইক নিয়ে যশোরের দিকে চলে যায়। ভিকটিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও সিম রাজু রেখে দেয়।
কিছুদূর যাওয়ার পর ইজিবাইকের ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে গেলে ১ হাজার ৪০০ টাকায় একটি খালি পিকআপে ইজিবাইকটি বেঁধে যশোরে নিয়ে যায় তারা। রাত ১১টার দিকে যশোর রেলস্টেশনে পৌঁছে ইজিবাইকটি আবুল কালামের কাছে দেয়। ৭ ডিসেম্বর সকালে আবুল কালাম ইজিবাইক বিক্রির ৫০ হাজার টাকা প্রদান করে। পরে বিকেলে তারা ট্রেনে করে খুলনায় ফিরে আসে।
২০১৫ সালের ১৫ মে খুলনা জেলা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক সরদার মো. হায়াত আলী আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
বেঞ্চ সহকারী নজরুল ইসলাম বলেন, রাজু শেখ ওরফে গাংগুয়া, শামীম ওরফে সবুজ মোড়ল, নুর আলম সিদ্দিক ওরফে কলিন্স ওরফে বাদশা এবং জয়ন্তের বিরুদ্ধে আরও তিনটি পৃথক ধারায় ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
এছাড়া এ মামলার অপর আসামি আবুল কালাম আজাদকে একটি ধারায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, রায় ঘোষণার সময় নুর আলম সিদ্দিক ওরফে কলিন্স ছাড়া বাকি আসামিরা পলাতক ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
এসএস/আরএন