বগুড়ার শেরপুর উপজেলার একটি সরকারি নিবন্ধিত এতিমখানা দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির নামে গত দুই অর্থবছরে ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে সর্বশেষ বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন বন্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব স্থগিত (ফ্রিজ) করা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ তদন্তে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে নিয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম।
গত ২৭ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মমিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এর আগে ১৩ জুলাই একই অভিযোগ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছেও দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের খুরতা গ্রামের সরকারি নিবন্ধনপ্রাপ্ত মানব উন্নয়ন কেন্দ্র এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিং (নিবন্ধন নম্বর-১২৪৪/০৭) দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নেই এবং অধিকাংশ সময় ভবনটি তালাবদ্ধ থাকে। অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মো. জুলফিকার আলী ও সহসভাপতি আবু রায়হান—দুজনই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও তারা প্রতিষ্ঠানটির নামে সরকারি অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শেরপুর উপজেলায় সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান পাওয়া ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মানব উন্নয়ন কেন্দ্র এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছে। দুই অর্থবছরে মোট অনুদানের পরিমাণ ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুস আলী, রেজাউল করিম ও মাহবুবুর রহমান জানান, প্রায় দুই বছর আগে এতিমখানাটি চালু হলেও সেখানে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী ছিল। তাদের দাবি, সরকারি অনুদান আসার আগে কিছুদিন প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হলেও অনুদান উত্তোলনের পর আবার বন্ধ করে দেওয়া হতো। বর্তমানে সেখানে কোনো কার্যক্রম নেই।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নাইম ইসলাম বলেন, “চলতি মাসের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে গিয়ে ভবনটি তালাবদ্ধ পাই। সেখানে কোনো শিক্ষা কার্যক্রম চলছিল না। স্থানীয়দের কাছ থেকেও একই ধরনের তথ্য পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”
অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মো. জুলফিকার আলী জুয়েল বলেন, “২০০৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছি। দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা অন্য একটি মাদ্রাসায় চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরাও সেখানে চলে গেছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা চলছে। সরকারি অনুদানের অর্থ এখনো প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবেই রয়েছে। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।”
এ বিষয়ে তৎকালীন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা (বর্তমানে শেরপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক) মো. ওবায়দুল হক বলেন, “আমার দায়িত্বে থাকাকালে প্রতিষ্ঠানটিতে অনেক এতিম শিক্ষার্থী ছিল। তবে আমার বদলির পর সেখানে মুহতামিম ও পূর্ববর্তী সভাপতিকে অপসারণ করা হয়েছে। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, সে বিষয়ে তখন কোনো অভিযোগ পাইনি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, “অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সর্বশেষ প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা অনুদান উত্তোলন ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে হিসাবটি ফ্রিজ করা হয়েছে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এসএএস/এসআর