ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
সুন্দরবনে বেড়েছে বাঘের সংখ্যা, তবুও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ
✎ এনায়েত করিম
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ৬:৪২ পিএম
X

একসময় সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার শিকারকে সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। সংঘবদ্ধ শিকারিরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে বনে প্রবেশ করে বাঘ হত্যা করত। কার্যকর আইন, নজরদারি ও জনসচেতনতার অভাবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের এই শীর্ষ প্রাণীটি একসময় চরম হুমকির মুখে পড়েছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তবুও চোরা শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো নানা কারণে সুন্দরবনের বাঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

বুধবার (২৯ জুলাই) আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস উপলক্ষে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষা করার বিষয় নয়; বরং পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তার সঙ্গেও এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে, যখন সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়। এরপর থেকে বন বিভাগ স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারিসহ প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সর্বশেষ শুমারিতে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালে ছিল ১১৪টি। ধারাবাহিক এই বৃদ্ধি সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে গত প্রায় আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে চোরা শিকারিদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধক্যে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘ মারা গেছে। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী।

বন বিভাগের দাবি, বর্তমানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। স্মার্ট পেট্রোলিং, নিয়মিত টহল, ড্রোন ও ক্যামেরা ট্র্যাপের ব্যবহার, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে মানুষ-বাঘের সংঘাত কমেছে। ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে কোনো বাঘ হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। বন বিভাগের সদস্যরা সেটিকে উদ্ধার করে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা দেওয়ার পর গত ১২ জুলাই আবারও সুন্দরবনে অবমুক্ত করেন। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণে আট কিলোমিটার এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বন বিভাগ এ ঘটনাকে বাঘ সংরক্ষণের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসের প্রাক্কালে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পূর্ব সুন্দরবনে দুই দফা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছে। প্রথমে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন অফিস চত্বরে এবং পরে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নদী সাঁতরাতে দেখা যায় একটি বাঘটিকে। দুটি ঘটনাই বনকর্মীদের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, নদী-খাল পেরিয়ে বাঘের চলাচল তাদের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাবারের সন্ধান, এলাকা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই তারা নিয়মিত সাঁতার কাটে। তবে এত কাছ থেকে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সরকার সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের কারণে বাঘ-মানুষের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সম্প্রতি ক্যামেরা ট্র্যাপে নতুন তিনটি বাঘের ছবিও ধরা পড়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দরবনের বাঘকে নিরাপদ রাখাই আমাদের লক্ষ্য।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহলমুক্ত। এতে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে বিচরণ করতে পারছে এবং বন অপরাধও কমেছে।

পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর প্রধান সমন্বয়কারী ড. নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন বাঁচলে উপকূলও নিরাপদ থাকবে।

বাঘ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজিজ বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, বনাঞ্চলের আবাসস্থল রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের টেকসই অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এসআর



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝