বান্দরবানের দুর্গম রুমা উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। গত প্রায় দুই মাসে উপজেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ৯৪ জন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার ঘাটতির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, ৩ জুন ২০২৬ থেকে উপজেলায় হামের উপসর্গযুক্ত রোগী শনাক্ত হতে শুরু করে। ২৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৯৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১১ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসা শেষে ৯ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আক্রান্তদের নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের পরিচয় হলো—প্রেইত এ ঙং খুমী (৫), পিতা: পএউং খুমী, লিতনপাড়া, ৭ নম্বর ওয়ার্ড, ২ নম্বর সদর ইউনিয়ন; পলে এ উং খুমী (৬), পিতা: শৈলুং খুমী, লুংথংসে পাড়া, ৭ নম্বর ওয়ার্ড, ২ নম্বর সদর ইউনিয়ন; ঙেতংএউং খুমী (৫), পিতা: তৈসাং খুমী, লুংথংসে পাড়া, ৭ নম্বর ওয়ার্ড, ২ নম্বর সদর ইউনিয়ন; কপাও ম্রো (১৩), পিতা: চন্দ্রয় ম্রো, অংলাই পাড়া, ৪ নম্বর ওয়ার্ড, ৪ নম্বর গ্যালেংগ্যা ইউনিয়ন; ডকিসাং মার্মা (৭), পিতা: কালামং মার্মা, নিয়াংখ্যং পাড়া, ৪ নম্বর ওয়ার্ড, ১ নম্বর পাইন্দু ইউনিয়ন; এবং হ্লাশৈসিং মার্মা (৪), পিতা: উহ্লামং মার্মা, পরোওয়া পাড়া, ১ নম্বর পাইন্দু ইউনিয়ন।
রুমা উপজেলা সদরঘাট এলাকার বাসিন্দা ঙৈনুচিং মার্মা বলেন, হামের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই পাহাড়ি পাড়াগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্গম এলাকার মানুষ সময়মতো চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় অনেক পরিবার উদ্বেগে রয়েছে। তিনি দ্রুত চিকিৎসা কার্যক্রম আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।
২ নম্বর সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অংসিংনু মার্মা বলেন, লুংথংসে পাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় একাধিক শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। তিনি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মেডিকেল টিম পাঠানোর দাবি জানান।
৪ নম্বর গ্যালেংগ্যা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেনরত ম্রো বলেন, অংলাই পাড়াসহ আশপাশের এলাকায় স্বাস্থ্যসচেতনতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি জ্বর বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।
হাম বা রিউবিওলা একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা ও টিকা না নিলে শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কের সংক্রমণসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়।
ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্রধান উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে—উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, শিশুর জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা গ্রহণই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা আরও সম্প্রসারণ, সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নিলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউএম/আরএন