যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে পাঁচ দফা আলোচনার পর লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামোগত সমঝোতা হয়েছে। শুক্রবার স্বাক্ষরিত এই সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রও তৃতীয় পক্ষ হিসেবে অংশ নেয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এক লিখিত বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, জাতিসংঘের সমন্বয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১০০ মিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা দেবে। পাশাপাশি লেবাননের সেনাবাহিনীকে সহায়তার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ৩০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে।
রুবিওর ভাষ্য অনুযায়ী, সমঝোতার আওতায় লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ, সংগঠনটির সামরিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি সাপেক্ষে ইসরায়েলি বাহিনীর সীমান্ত থেকে ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ‘মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ ফর লেবানন’ নামে একটি পাইলট সমন্বয় কাঠামো গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, এই সমঝোতা দেশটির সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এটি নতুন কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করছে না; বরং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ১৭০১ এবং ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়নকে এগিয়ে নেবে। তার মতে, লেবাননে অস্ত্র বহনের অধিকার কেবল রাষ্ট্রীয় বাহিনীরই থাকবে।
আলোচনায় হিজবুল্লাহ সরাসরি অংশ না নিলেও রুবিও জানান, সংগঠনটির সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল। বর্তমানে লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা দেশটির নিয়মিত সেনাবাহিনীর তুলনায় বেশি বলে ধারণা করা হয়।
ওয়াশিংটনে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামেদা মোয়ায়েদ আলোচনাকে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, এই সমঝোতা লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের প্রথম ধাপ।
অন্যদিকে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়াখেল লেইতার বলেন, “ইরান ও হিজবুল্লাহ বাইরে, আর ইসরায়েল–লেবানন শান্তির পথ এখন উন্মুক্ত।”
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান বজায় রাখবে। লিতানি নদীর উত্তর–দক্ষিণ অংশে দুটি পাইলট জোন গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সরে গেলে সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন হবে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে; পর্যবেক্ষকদের মতে, সীমিত সক্ষমতার লেবাননের সেনাবাহিনী কতটা কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
এদিকে আনাদোলু এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, চলমান এই আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির দাবি, কোনো শর্ত ছাড়াই লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।
টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাইম কাশেম বলেন, “ইসরায়েলকে কোনো শর্ত ছাড়াই লেবানন ছাড়তে হবে। লেবাননের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশ্রুতি গ্রহণযোগ্য নয়।”
ইসরায়েলের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’ জানায়, আলোচনায় অন্যতম বিরোধের বিষয় ছিল তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা অ্যান্টি-ট্যাংক লাইন। এপ্রিল মাসে নির্ধারিত এই রেখাটি ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় আট কিলোমিটার লেবাননের অভ্যন্তরে বিস্তৃত।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪,২৩০ জন নিহত এবং ১২,১৭৯ জন আহত হয়েছেন।
সূত্র: রয়টার্স