চোখে আলো নেই। কিন্তু স্বপ্ন আছে, জেদ আছে, আছে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সেই স্বপ্নপথে আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন নওগাঁর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তরুণ মাহবুব জামান। ১৯তম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি ল্যাপটপ।
বুধবার সকালে নওগাঁ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ল্যাপটপটি গ্রহণের সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মাহবুব। উপস্থিত সবার করতালির মধ্যে তার মুখে ছিল আত্মবিশ্বাসের হাসি।
মাহবুব জামান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা কখনোই তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে আরও এগিয়ে নিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তিনি। কিন্তু ব্যক্তিগত ল্যাপটপ না থাকায় প্রতিনিয়ত সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল।
ল্যাপটপ হাতে পেয়ে মাহবুব জামান বলেন, “উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পর নিজেকে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। কিন্তু নিজের ল্যাপটপ না থাকায় অনুশীলনে অনেক সমস্যা হতো। জেলা প্রশাসনের এই সহায়তা আমাকে নতুনভাবে এগিয়ে যেতে সাহস জোগাবে। আমি চাই, নওগাঁর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তি ও শিক্ষার সুযোগ পাক। ভবিষ্যতে তাদের নিয়ে কাজ করতে চাই।”
‘অটিজম কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, প্রতিটি জীবন মূল্যবান’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিবসটি উপলক্ষে জেলা প্রশাসন, জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর ও প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র যৌথভাবে নানা কর্মসূচির আয়োজন করে।
সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে একই স্থানে এসে শেষ হয়। পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নূর মোহাম্মদ।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “প্রতিবন্ধিতা কোনো মানুষের মেধা বা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নয়। সঠিক সুযোগ, প্রযুক্তি ও সহযোগিতা পেলে তারাও সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে। মাহবুব জামানের মতো তরুণরা আমাদের অনুপ্রেরণা। জেলা প্রশাসন সবসময় তাদের পাশে থাকবে।”
এসময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদুল হক, সহকারী পরিচালক মোহতাসিম বিল্লাহ, জেলা প্রতিবন্ধী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আহাদ আলী, কনসালট্যান্ট সাবেরা সুলতানা এবং আশার আলো অটিস্টিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ওছিম উদ্দিন বক্তব্য দেন।
আলোচনা শেষে ১২ জন প্রতিবন্ধীর মধ্যে হুইলচেয়ারসহ বিভিন্ন সহায়ক সামগ্রী বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই বলেন, সমাজের সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সুযোগ ও সহযোগিতা। আর সেই সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধীরাও হয়ে উঠতে পারেন সমাজের সম্পদ। মাহবুব জামানের গল্প যেন সেই বার্তাই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।
কেকেএইচ/এসআর