ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
নওগাঁয় চার খুন: তদন্তে জমি বিরোধের ইঙ্গিত
✎ অবজারভার প্রতিনিধি
⏲ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:২৯ পিএম
X

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে একই পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গলা কেটে দম্পতি এবং দুই শিশুকে পিটিয়ে হত্যার এই ঘটনায় প্রথমে ডাকাতির ধারণা করা হলেও তদন্তে সামনে আসছে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত।

সোমবার (২০ এপ্রিল) দিনগত রাতের কোনো এক সময়ে বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের একটি বাড়িতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। ফজরের নামাজের পর বাড়ির দরজা খোলা দেখে সন্দেহ হলে প্রতিবেশীরা ভেতরে ঢুকে চারজনের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দিলে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নিহতরা হলেন— নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩২), তাঁর স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), ছেলে পারভেজ (৯) ও তিন বছরের কন্যা সাদিয়া আক্তার। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। কেউ বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন, কেউ আবার বিলাপ করে বিচার দাবি করছেন।

হত্যার ধরন ও প্রাথমিক ধারণা

পুলিশ জানায়, হাবিবুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। অপরদিকে শিশু দুই সন্তানকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাবিবুর রহমান পেশায় গরু ব্যবসায়ী ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি মান্দার চৌবাড়িয়া হাট থেকে গরু বিক্রি করে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এ কারণে অনেকেই ধারণা করছেন, টাকার লোভে দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে লুটপাটের পর পরিবারের সবাইকে হত্যা করে।

জমি নিয়ে বিরোধের ইঙ্গিত

তবে তদন্তে উঠে আসছে ভিন্ন চিত্রও। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হাবিবুর রহমান তাঁর বাবার একমাত্র ছেলে। তাঁর বাবা পাঁচ মেয়েকে ১০ কাঠা করে জমি এবং হাবিবুরকে বাড়িভিটাসহ প্রায় ১০ বিঘা জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। এই জমি বণ্টনকে কেন্দ্র করে ভাই-বোনদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এলাকাবাসীর ধারণা, এই দ্বন্দ্ব থেকেই পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।

নিহত হাবিবুর রহমানের বাবা নমির উদ্দিন বলেন, “জমিজমা নিয়ে অনেকদিন ধরেই অশান্তি চলছিল। আমার মেয়েরা ও তাদের স্বামীরা এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। তারা বিভিন্ন সময়ে আমার ছেলেকে হত্যার হুমকিও দিয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে সঠিক তদন্ত ও বিচার চাই।”

স্বজনদের অভিযোগ ও আহাজারি

নিহত পপি সুলতানার মা সাবিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “১৩-১৪ বছর আগে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। বিয়ের পর থেকেই ওরা আমার মেয়েকে নির্যাতন করত। একবার তো বাচ্চা হওয়ার পর তাকে তালাকও পাঠিয়েছিল। পরে আমার জামাই নিজেই আবার সংসার করতে চায়, তাই তার ওপর ভরসা করে মেয়েকে পাঠাই। কিন্তু নির্যাতন বন্ধ হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “কয়েকদিন আগেও ননদ শিরিনা, তার স্বামী ভুটি আর তাদের পরিবারের লোকজন মিলে আমার মেয়েকে মারধর করেছে। আমরা থানায় গিয়েছিলাম, কিন্তু সঠিক বিচার পাইনি। পরে গ্রামে সালিশ হলেও পরিস্থিতি ঠিক হয়নি।”

জমি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার জামাইকে ১০ বিঘা জমি দেওয়াতেই তাদের সমস্যা। তখন থেকেই হিংসা শুরু হয়। তারা পরিকল্পনা করে এই পরিবারটাকে শেষ করে দিয়েছে।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি অভিযোগ করেন, “ডালিমা, শিরিনা, সুফি, সাহানারা আর কমেলা— এই পাঁচ বোন এবং তাদের স্বামীরা মিলে আমার মেয়ে-জামাইকে মেরে ফেলেছে। আমি এদের সবার ফাঁসি চাই।”

মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের কথা বলতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন— “রাতেও মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। সে বলছিল, ‘মা, তোমার নাতি পিঠা খাবে।’ আমি বললাম, বানিয়ে দিও। সে বলল, ‘মা, রাত হয়ে গেছে, কাল বানাবো।’ কে জানত এটাই শেষ কথা!”

অন্যদিকে নিহত পপির বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি বলেন, “আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট করে সংসার করছিল। ওদের অত্যাচার সহ্য করেও সংসার বাঁচাতে চেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মেরে ফেলল। আমার তিন বছরের নাতনিকেও ছাড়েনি। আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলের ফাঁসি চাই।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা বারবার বিচার চেয়েছি, কিন্তু ঠিকমতো কোনো ব্যবস্থা হয়নি। যদি আগে ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো আজ আমার মেয়েটা বেঁচে থাকত।”

পুলিশের বক্তব্য ও তদন্ত অগ্রগতি

নিয়ামতপুর থানার কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে ডাকাতির বিষয়টি সামনে এলেও পারিবারিক বিরোধসহ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।

নিয়ামতপুর থানার ওসি হাবিবুর রহমান বলেন, “প্রাথমিকভাবে ডাকাতির উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তরা বাড়িতে প্রবেশ করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পারিবারিক বিরোধসহ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।”

ডাকাতি নয়, জমিজমা সংক্রান্ত জেরে হত্যা: এসপি

পুলিশি হেফাজতে বাবা, দুই বোন ও ভাগনে
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে এ কথা জানান পুলিশ সুপার। এদিকে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

তারা হলেন— নিহত হাবিবুর রহমানের বাবা নমির উদ্দিন (৭০), বোন ডালিমা ও হালিমা এবং ভাগনে সবুজ রানা (২৫)।

পুলিশ সুপার বলেন, “প্রাথমিকভাবে এ হত্যাকাণ্ড কোনো ডাকাতি বা দস্যুতার ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। ঘটনাটি পরিবার-সংক্রান্ত বা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে হতে পারে। যে গৃহবধূ মারা গেছেন, তাঁর কানে এখনো গহনা (দুল) রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট একযোগে কাজ করছে। দ্রুতই ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা হবে।”

তিনি বলেন, মরদেহগুলো উদ্ধার করে বিকেলে ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নিয়ামতপুরের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এখনো রহস্যে ঘেরা। ডাকাতি নাকি জমি বিরোধ— কোনটি এই হত্যার মূল কারণ, তা নির্ভর করছে তদন্তের ওপর। তবে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার এই ঘটনায় স্বজনদের কান্না আর বিচার দাবিই এখন সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেএইচ/আরএন


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝