একদিকে তেলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অন্যদিকে লম্বা লাইনে তেল সংগ্রহ করতে মোটরসাইকেল চালকদের ভোগান্তি এখন চরমে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল না পাওয়ায় হতাশা দেখা দিয়েছে। এমনকি তেলের এই সংকটের প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেল বাজারেও। নতুন মোটরসাইকেল কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আগ্রহ কমেছে, ফলে শোরুমগুলোতে বিক্রি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। এতে বড় ধাক্কা খাচ্ছেন জয়পুরহাটের মোটরসাইকেল ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাটের ২০টি জ্বালানি তেলের পাম্পের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটিতেই তেল পাওয়া যাচ্ছে। অধিকাংশ পাম্প তেল সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে। যেসব পাম্পে তেল দেওয়া হচ্ছে, সেখানে সকাল থেকে শত শত মোটরসাইকেলের চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে জ্বালানি নিতে মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট বাধ্যতামূলক করায় সাধারণ চালকরা চাপে পড়েছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেল বিক্রিতেও। তবে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনের জন্য বিআরটিএ অফিসে অতিরিক্ত চাপ পড়েনি।
বিআরটিএ জয়পুরহাট সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক রাম কৃষ্ণ পোদ্দার বলেন, এ জেলায় জ্বালানি তেলচালিত ৫০ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ হাজারের বেশি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নেই। এছাড়া অনেক চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। বর্তমানে জ্বালানি পাম্পগুলোতে গেলে রেজিস্ট্রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট না দেখালে তেল দেওয়া হবে না। তবু বিআরটিএতে এর প্রভাব তেমন পড়েনি। গত ১০ দিনে ২৯টি মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশনের আবেদন এসেছে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনও স্বাভাবিক রয়েছে। তবে তেলের শর্ত থাকায় ভবিষ্যতে রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।
জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতায় জয়পুরহাটের মোটরসাইকেল শোরুমগুলোতে বড় ধরনের মন্দা তৈরি হয়েছে। সরেজমিনে জেলা শহরের বিভিন্ন কোম্পানির শোরুম ঘুরে জানা গেছে, তেল সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ক্রেতাদের আনাগোনা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। আগে যেখানে সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাইক বিক্রি হতো, এখন তা এক-তৃতীয়াংশে নেমেছে। বিশেষ করে ঈদের মৌসুমে গত বছরের তুলনায় বিক্রি কম। টাকা কমের অফার থাকা সত্ত্বেও ক্রেতারা মোটরসাইকেল কিনছেন না। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে জয়পুরহাটের মোটরসাইকেল ব্যবসায় দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা নেমে আসবে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন।
দি ফ্রেন্ডস মটরস শোরুমে ইয়ামাহা কোম্পানির মোটরসাইকেল বিক্রি করা হয়। শোরুম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে ৫০টি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৪০টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। মার্চ মাসে ঈদ হওয়ায় এ মাসে ৭০টির মতো গাড়ি বিক্রি হয়েছে। তবে ঈদের পর গত ৩-৪ দিনে কোনো গাড়ি বিক্রি হয়নি। তেল সংকটের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
হোন্ডা কোম্পানির শোরুম এ-ওয়ান ইমপেক্সের স্বত্বাধিকারী শ্যামল কুমার ঘোষ বলেন, “বিগত ঈদ মৌসুমে আমরা একশটির বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি করেছি, কিন্তু এবার মাত্র ৭০টি। ঈদের পর গত সাতদিনে মাত্র ৩টি গাড়ি বিক্রি হয়েছে। যেখানে ১৫টির মতো বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। আমাদের ২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড়ের অফারও রয়েছে, তবু ক্রেতারা আসছেন না। তেলের সংকট এবং রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স শর্তের কারণে এটি আরও প্রভাবিত হচ্ছে।”
হাসান ট্রেডিংয়ের মালিক মেহেদী হাসান বলেন, “আমাদের এখানে বাজাজ কোম্পানির মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। ঈদ মৌসুমে প্রতি বছর ১৫০-২০০টি বিক্রি হতো, এবার মাত্র ৪১টি। জয়পুরহাট এলাকা কৃষি নির্ভর। মানুষ আলু ও ধান বিক্রি করে মোটরসাইকেল কেনে, কিন্তু আলুর দাম কমেছে। তার ওপর তেলের প্রভাবও পড়েছে, তাই বিক্রি কমেছে।” একই ধরনের মন্তব্য করেছেন ইয়ানাত ট্রেডার্সের পরিচালক তারিকুল ইসলাম এবং হিরো হোন্ডা শোরুম ফাহিম মটরসের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম।
সুজুকি মোটরসাইকেল ডিলার নেওয়া রাসেল ট্রেডিংয়ের সেলস এক্সিকিউটিভ হামিম হোসেন বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে গাড়ি বিক্রি নেই বললেই চলে। মানুষ গাড়ি দেখতেও আসছে না। ঈদের সময়ে ১০ হাজার টাকা ছাড়ের একটি গাড়ি ৬২টি বিক্রি হয়েছে। এখনও অফার চলছে, কিন্তু ঈদের পর কোনো গ্রাহক নেই। তেলের সংকট এবং রেজিস্ট্রেশন ছাড়া তেল না পাওয়া এটিকে আরও প্রভাবিত করেছে।”
এদিকে খোলা বাজারে পেট্রোল তেল না পাওয়ায় সেচযন্ত্রের (পানি তোলার মেশিন) বিক্রিও কমেছে। মেসার্স বেঙ্গল মেশিনারীজের স্বত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেন বলেন, “প্রতিদিন ৪-৫টি সেচ মেশিন বিক্রি হতো, কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে কোনো মেশিন বিক্রি হয়নি। গ্রাহকও দাম জানতে আসছেন না। দ্রুত জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি করছি।”
জয়পুরহাটের জেলা প্রশাসক আল-মামুন মিয়া সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, জ্বালানি পাম্পে মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং হেলমেট ছাড়া পেট্রোল বা অকটেন দেওয়া হবে না। প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের কার্যক্রম তদারকির জন্য ২০ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিদিন জ্বালানি বিক্রির কার্যক্রম তদারকি করছেন।
এসআই/আরএন