মুকুলের ভারেই যেন ভেঙ্গে পড়বে আমের ডাল। মুকুলে ঠাসা আম গাছ হঠাৎ দেখলে এমন ভয়ও জাগতে পারে। কিন্তু এ ভয়ের আড়ালে যে সুখবর হাসে! নওগাঁর নিয়ামতপুরে এখন যে দিকে চোখ যায় শুধু মুকুল আর মুকুলের অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য। পাগল করা মুকুলের গন্ধ আবহমান বাংলার স্বর্গীয় রূপ মেলে ধরেছে নিয়ামতপুরে। এতে দারুণ আশাবাদী আম চাষী, ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
তাদের আশাবাদ, আমের ফলন এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। ইতিমধ্যে কোনো কোনো গাছে আমের গুটি আসতেও দেখা গেছে। জেলার নিয়ামতপুরের সর্বত্রই এই সুসংবাদের হাতছানি।
অন্যদিকে, আমের তৃতীয় স্থান অর্জনকারী জেলার নিয়ামতপুর উপজেলায় বেড়েই চলেছে আমের চাষ। গত কয়েক বছর ধরে নিয়ামতপুরে অব্যাহত ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে আম চাষ।
এক হিসাবে মতে, গত আট বছরে নিয়ামতপুরে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে তিনগুন। সেই সাথে উৎপাদনও বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশী।
এবারও আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে রেকর্ড পরিমাণে। তাই উৎপাদনেও স্মরণকালের সবচেয়ে বেশী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এ বছর। চলতি বছর নিয়ামতপুরে আম চাষে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে। আর আম উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ১৬০ মে. টন। এটিও স্মরণকালের সবচেয়ে বেশী লক্ষ্যমাত্রা।
তবে আম গাছে যে পরিমাণ মুকুল এসেছে, তাতে এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়ে রেকর্ড পরিমাণ আম উৎপাদন হবে বলেও আশা করছে কৃষি বিভাগ।
নিয়ামতপুরে আমকে কেন্দ্র করে কোনো আড়ৎ না হওয়ায় আম চাষীরা বেকায়দায় য়াছেন। পোরশা, রাজশাহী, নওগাঁ সদর, সাপাহারে আম বিক্রির জন্য গেলে আম চাষীরা নায্য দাম পান না। তার উপর অতিরিক্ত পরিবহন খরচ পড়ে যায়।
আম চাষীদের প্রাণের দাবি, নিয়ামতপুরে আমের আড়ৎ যেন হয় সে জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জায়গা প্রদান করা। এছাড়া নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার এলাকায় আমসহ বিভিন্ন সবজি সংরক্ষণের জন্য কোল্ড ষ্টোরেজ একান্ত প্রায়োজন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ এলাকার বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জয় লাভ করে সংসদ সদস্য হিসাবে শপথ নিয়েছেন। উপজেলাবাসীর আশা নতুন সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান আমের আড়ৎসহ আমের বাজার তৈরীর এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করবেন।
নিয়ামতপুরে প্রায় শতাধিক জাতের আম উৎপন্ন হয়। তবে এবার ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত, বোম্বাই, হিমসাগর, ফজলি, আম্রপালি, আশ্বিনা, ক্ষুদি, বৃন্দাবনী, লক্ষণভোগ, কালিভোগ, তোতাপরী, দুধসর, লক্ষনা, ও মোহনভোগ জাতের আম বেশী চাষ হয়েছে। গাছে গাছে বাহারী জাতের আম এখন দেশের কোটি কোটি মানুষের রসনা মেটাতে প্রস্তুত হচ্ছে। সব ভেবে চাষীদের মনে উঁকি দিচ্ছে মুনাফার আগাম বার্তা। গাছের মুকুল কীটপতঙ্গের হাত থেকে বাঁচাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষীরা।
আম চাষী আব্দুর রহিম বলেন, 'আম গাছে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ, সার ও সেচ প্রদানসহ গাছের পরিচর্যা ছাড়া আম চাষীদের এখন অন্য কিছু করার ফুসরত নেই। মুকুলে ডায়াথেন এম ও কনফিডর পরিমাণমত পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা হচ্ছে যেন মুকুলে কোনো ধরনের পোকার আক্রমণ না হয়। আবার গুটি ধরার পর আরেক দফা স্প্রে করা হবে।
আম চাষী রসুলপুর ইউনিয়নের সদস্য ও ভীমপুর গ্রামের মো. শহিদুজ্জামান তরফদার কাজল বলেন, 'আমার ১৫ বিঘা আম্রপালী গাছের বাগান রয়েছে। ৩ বছর মেয়াদী লিজ দেওয়া রয়েছে। ৩ বছরে ১৫ লক্ষ টাকা। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাছে পর্যাপ্ত মুকুল এসেছে। কয়েকদিন আগে নিয়ামতপুরসহ আশপাশে কুয়াশা দেখা দিয়েছে। এতে কিছুটা মুকুল ও আম গাছের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'তবে এই মুহুর্তে শিলা বৃষ্টি হলে আমের মুকুলের ব্যাপক ক্ষতি হবে। তাই আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে বর্তমানে শঙ্কিত। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এবার বাম্পার ফলন হবে।'
নিয়ামতপুর গ্রামের আম চাষী গোলাম মর্তুজা বলেন, 'পাঁচটি আম বাগান রয়েছে। এবার গাছে ভালো মুকুল হয়েছে। যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি না হয় তাহলে আশানারুপ ফলন পাবো। আশা করছি দামও ভালো পাবো।'
আরেক আম চাষী হাজিনগর ইউনিয়নের মোহাম্মাদপুর গ্রামের এ্যাডভোকেট আব্দুল আলিম বলেন, 'আমার ৫০/৬০ বিঘা জমিতে আম বাগান রয়েছে। বেশীর ভাগই আম্রপালী জাতের। কিছু ল্যাংড়া গাছ রয়েছে সেগুলোর মাথা ছেঁটে দেওয়া হেয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী- আমি বাগানে সব রকমের ব্যবস্থা নিচ্ছি। এবার মুকুল খুব ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলনও ভালো হবে আশা করছি। মুকুল থেকে আম ফুটে বের হলে বাগান বিক্রি করে দেই। এতে ভালোই লাভ হয়। মুকুল পুরো ফোটার আগে গাছে ডায়াথন এম ও কনফিডর পরিমাণমত পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করেছি, যেন মুকুলে কোনো ধরনের পোকার আক্রমণ না হয়।'
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, 'এ বছর নিয়ামতপুরে ৬৭৫ আম বাগানে ১ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে আম গাছে ১০০ শতাংশ আমের মুকুল এসেছে। আগামী দিনগুলোয় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এখান থেকে প্রতি হেক্টরে ১২ টন করে মোট প্রায় ১৭ হাজার ১৬০ টন আম উৎপাদন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে গাছে কোনো পোকার আক্রমণ দেখা দিলে নির্ধারিত মাত্রানুযায়ী কীটনাশক দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'এবারে আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আম উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি। বর্তমানে উপজেলায় আম নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। ভবিষ্যতেও যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া আর কোনো সমস্যা না হয় সে দিকে আমরা সবসময় নজর দিচ্ছি। এছাড়া নিরাপদ আম উৎপাদনের জন্য ফল ব্যাগিং এবং ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।'
এ বিষয়ে উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সফিউল ইসলাম বলেন, 'আমরা মাঠে মাঠে আম চাষীদের বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করে থাকি। ইতিমধ্যে সকল আম গাছে ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক স্প্রে করা হয়েছে যাতে আমের মুকুলের কোনো রোগ বালাই না হয়। আমাদের উপজেলায় তেমন কোনো সমস্যা নেই।'
টিএইচ/এমএ