বাংলাদেশের প্রথম মোংলা বন্দরে নির্মিত আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিঃসৃত তেল অপসারণ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারী) দুপুরে মোংলা-ঘষিয়াখারী চ্যানেলের তীরে নির্মিত নতুন এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন।
প্রায় ৬শ কোটি টাকায় নির্মিত এই প্রকল্পের উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা জানান, এটি বাংলাদেশে প্রথম মোংলা বন্দরে নির্মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। এটি একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে নির্মিত হয়েছে। এ প্রকল্পের সুবিধা-অসুবিধা পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম ও ফায়ারার বন্দরে আরও দুইটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী প্রতিটি সমুদ্র বন্দরে বর্জ্য ও তেল নিঃসরণের জন্য কার্যকর প্রকল্প থাকা বাধ্যতামূলক।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল শাহীন রহমান, বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডোর মোঃ শফিকুল ইসলাম সরকার, সদস্য (অর্থ) ও পরিচালক (প্রশাসন) (অ:দা:) কাজী আবেদ হোসেন (যুগ্মসচিব), সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) ড. এ. কে. এম. আনিসুর রহমান (যুগ্মসচিব), পরিচালক (বোর্ড) কালাচাঁদ সিংহ (যুগ্মসচিব), হারবার মাস্টার ও প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামসহ সকল বিভাগীয় প্রধান, বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বন্দর ব্যবহারকারীরা।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল শাহীন রহমান জানান, বাংলাদেশ MARPOL কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে নিজস্ব সমুদ্রসীমাকে জলযান থেকে সৃষ্ট দূষণ থেকে রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। আন্তর্জাতিক বন্দরসমূহে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকলে সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে আসে এবং জলযান থেকে সৃষ্ট বর্জ্য নিরাপদভাবে নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়। বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে নির্গত বর্জ্য ও দুর্ঘটনাগ্রস্ত জাহাজ থেকে নিঃসৃত তেল সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপসারণ ও পরিশোধন করার সক্ষমতা যে কোনো আন্তর্জাতিক বন্দরের জন্য বাধ্যতামূলক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, মোংলা বন্দর নবনির্মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মাধ্যমে এই মানদণ্ড নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক MARPOL কনভেনশনের সকল শর্তাবলি নিশ্চিত করে নির্মিত এই প্লান্টটি বন্দরে আগত সকল বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে দূষিত তরল ও অন্যান্য বর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ ও পরিশোধন করবে, যা পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বন্দর সূত্র জানাচ্ছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের প্রধান উপাদানসমূহের মধ্যে রয়েছে: ২টি তেল অপসারণকারী জলযান, ১টি বর্জ্য সংগ্রহকারী জলযান, পিআরএফ প্লান্ট, ১টি ডাম্প বার্জ, ১টি সেল্ফ প্রপেলড বার্জ, ১টি সার্ভিস টাগ বোট, ১টি পন্টুন, নির্মিত জেটি ও ইয়ার্ড।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার ও প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, বন্দরের বিশেষায়িত জাহাজের মাধ্যমে বন্দর ও বহিঃসাগরে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে দূষিত পানি ও তেল মিশ্রিত বর্জ্য সময়মতো সংগ্রহ করে প্লান্টের নিজস্ব জেটিতে আনা হবে। এরপর এই বর্জ্যকে বিশেষায়িত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে পরিশোধনের ধরন নির্ধারণ করা হবে। প্লান্টের পরিশোধনাগারে দক্ষ প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে ধাপে ধাপে বর্জ্য পরিবেশবান্ধব করা হবে।
নবনির্মিত এই প্লান্টের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সংগৃহীত বর্জ্য পরিশোধনের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য তরল ও অন্যান্য উপাদানে রূপান্তরিত করে, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন কলকারখানার কাঁচামাল ও জ্বালানী হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। এই প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত পরিমাণ তৈলাক্ত বর্জ্য পরিশোধন করে প্রায় ৮৫% পানি, ১২% ব্যবহারযোগ্য জ্বালানী ও ৩% ছাই উৎপন্ন হয়। এই জ্বালানী সাশ্রয়ী মূল্যে কলকারখানায় ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় উৎপাদন খরচ হ্রাসে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর একনেকে এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়। তখন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪০১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। নির্মাণ কাজ শেষ করতে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬শ কোটি টাকা। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেইউ/আরএন