খুলনার ডুমুরিয়া সহ সারাদেশে পলিথিন ও প্লাস্টিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এগুলো মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত করে, জলজ প্রাণী ও পাখিসহ হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণী হত্যা করছে (খাবার ভেবে খেয়ে ফেলা বা আটকে পড়ার কারণে), মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর সমাধানে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহার (recycling) এবং সরকারের কঠোর নীতিমালা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
ডুমুরিয়া উপজেলায় বর্তমানে পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। লোকালয়ে ব্যবহৃত পলিথিন ও প্লাস্টিক খাল ও নদীতে জমা হচ্ছে। আগত পর্যটকদের কারণে ব্যাপক হারে প্লাস্টিক বোতল, চিপস, পলিথিন ও অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে। এতে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা বন্যপ্রাণীর খাদ্যগ্রহণ ও প্রজননে বাধা সৃষ্টি করছে, মাটি ও পানির গুণমান হ্রাস করছে এবং মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক বিভিন্ন নদী দিয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হচ্ছে। পর্যটকদের ব্যবহৃত ও ফেলে দেওয়া পলিথিন ও প্লাস্টিক সরাসরি বনের মধ্যে জমা হচ্ছে, যা সৌন্দর্যহানি এবং দূষণ বাড়াচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ত্রাণসামগ্রীর প্লাস্টিক বর্জ্য বনের মধ্যে জমা হয়। নদীর পাড়ের আশেপাশের শহর ও কারখানা থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে মিশে বনের দিকে চলে আসছে। এতে বনের পরিবেশ ও প্রাণীজগত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কচ্ছপ, বানর, মাছ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী প্লাস্টিক খেয়ে বা এতে জড়িয়ে মারা যাচ্ছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন মাটি, পানি এবং মাছের পেটেও পাওয়া যাচ্ছে, যা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহেও প্রবেশ করছে। প্লাস্টিক বর্জ্য ম্যানগ্রোভের ঘনত্ব ও উচ্চতা হ্রাস করছে এবং মাটি ও পানির গুণমান নষ্ট করছে।
উল্লেখ্য, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ গাছ সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া মাটির ওপর উঠে আসা শ্বাসমূল বা নিউম্যাটোফোরের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করে। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য এই শ্বাসমূলগুলো ঢেকে দেয়, যার ফলে গাছ পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পেয়ে মারা যায়। হরিণ, কচ্ছপ এবং মাছের মতো বন্যপ্রাণীরা অনিচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিক খেয়ে ফেলছে, যা তাদের অকাল মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। এছাড়াও, মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় বনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীতে প্লাস্টিক মিশে মাছের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করছে। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া ও জোয়ারের পানির মাধ্যমে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য পানির গুণমান কমিয়ে দিচ্ছে। খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছ ও কাঁকড়ার শরীরে প্রবেশ করছে, যা ওই অঞ্চলের মানুষ যারা এসব মাছ খাচ্ছেন তাদের শরীরেও ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রবেশ করাচ্ছে।
সমাধানের পথ হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। পর্যটকদের মধ্যে একবার ব্যবহারের প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে সচেতনতা তৈরি করা, বনের ভেতরে ও আশেপাশে কার্যকর বর্জ্য অপসারণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, এবং প্লাস্টিক দূষণ পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান, সুন্দরবনকে প্লাস্টিক দূষণসহ বিভিন্ন সমস্যা থেকে রক্ষা করতে কাজ করছেন এবং পর্যটকদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “সুন্দরবনের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্লাস্টিক দূষণ। পর্যটন মৌসুমে পর্যটকরা সুন্দরবনের নদী-খালে চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট, প্লাস্টিকের পানির বোতল, পলিথিন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লেট-গ্লাস নিয়ে যান। এসব প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে ফেলা হয়, আর নদীর জোয়ার-ভাটায় ১০-১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বনের অভ্যন্তরে চলে যায়। এসব বর্জ্য সুন্দরবনের গাছের শ্বাসমূলের উপর জড়িয়ে থাকে। এর ফলে শ্বাসমূল বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণে ব্যর্থ হয়, প্রাণশক্তি হারিয়ে গাছ মারা যায়।”
পলিথিন ও প্লাস্টিকের আগ্রাসন সুন্দরবনের পরিবেশ, বন্যপ্রাণী ও মানুষের জীবনযাত্রাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি। সুন্দরবন রক্ষায় প্লাস্টিক দূষণ রোধে পর্যটকদের সচেতনতা এবং সরকারি পর্যায়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।
এমএইচ/আরএন