ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
নদীর বরফ ঠান্ডা জলে বেঁচে থাকার যুদ্ধ
✎ এস কে দোয়েল
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২১, ১১:৫৮ এএম আপডেট: ২১.১২.২০২১ ৪:৩৬ পিএম
বরফ ঠান্ডা জল। শীতের ভোর। হাঁড়কাপা শীতে জীবিকার তাগিদ। পাথর তুলতে এই বরফগলা জলে নেমে পড়েন শত শত দলবাধা শ্রমিক। যেন পাথরের শরীর, শীত স্পর্শ করে না। পেটের ক্ষুধা আর পরিবারের মৌলিকা চাহিদা পূরণ করতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানকৌড়ি পাখির মতো ডুবে ডুবে তোলেন পাথর। 

সন্ধ্যায় হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষে উত্তোলিত পাথর মহাজনের কাছে বিক্রি বাজার সদাই করে অন্ন জুটে পরিবারের মুখে। এ যেন বরফ জলে জীবিকার লড়াই। এ চিত্র দেশের উত্তরের পঞ্চগড়েতেঁতুলিয়ার সীমান্ত প্রবাহিত নদী মহানন্দার।

দেড় লাখ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় অর্ধ-লক্ষাধিক পাথর শ্রমিক। এ পাথর উত্তোলিত হচ্ছে নদী থেকে। দু’সীমান্তে বুক চিরে প্রবাহিত নদী মহানন্দায় হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকার বিশাল ভান্ডার। কেউ কেউ ভাগ্যদেবতাও মনে করে মহানন্দাকে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ সিএফটি নুড়ি পাথর তোলা হচ্ছে এ নদী থেকে। 

ভোর সকালে বরফগলা ঠান্ডা পানিতেই শ্রমিকরা দলবেঁধে হাওয়ায় ফোলানো গাড়ির টিউব, লোহার খাটাল (চালুনী)  ও লোহার রড নিয়ে নেমে পড়ছে নদীতে। দিনভর চলে পাথর উত্তোলন। সে পাথর ভাসানো টিউবের ঢাকিতে করে নদীর কিনারে এনে সেখান থেকে দু'কাঁধে ভরে তীরে স্তূপ করে।

প্রতিদিন দিন শেষে মজুরী হিসেবে মেলে পাঁচ-সাতশ টাকা। উপার্জনের অন্য কোন ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন শীতকে উপেক্ষা করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বরফগলা পানিতে নেমে নুড়ি পাথর কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা। 

শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় শফিউর রহমান, নুর ইসলাম ও আব্দুল করিম জানান, সকাল ৮টায় নদীতে নেমেছেন তারা। পানি খুব ঠান্ডা। কিছু করার নেই। বাইরে কাজ নেই। 

সরকার পাড়া গ্রামের পাথর শ্রমিক রেজাউল ইসলাম বলেন, ভাই এই মহানন্দা নদী আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে। আমার দুই মেয়ে এক ছেলে। সকালে নদীর পানি বরফের মতো ঠান্ডা। কাজ না করলে খাব কী। 

একই কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বুড়িমুটকী গ্রামের সফিকুল ইসলাম বলেন, ঘরে স্ত্রীসহ চার মেয়ে। সন্তানের ভরণ-পোষণ চলে এই পাথর জীবিকার উপর। দিনভর দলের সঙ্গে বরফগলা ঠান্ডা পানিতে পাথর তুলে সন্ধ্যায় পারিশ্রমিক নিয়ে পরিবারের যাবতীয় মৌলিক চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করি। 

এতো ঠান্ডা পানিতে কাজ করছেন, পরে অসুখ ধরে না প্রশ্ন করলে মোতালেব আর রবিউল জানান, হ্যাঁ ভাই, সর্দি-জ্বর তো হচ্ছে। কয়দিন জ্বরে ছিনু (ছিলাম)। কাম না করে উপায় নাই। অনেক সময় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কখনো কখনো বন্ধ হয়ে যায় পাথর উত্তোলনের কাজ। এতে কমে যায় রুজি-রোজগার। তবুও প্রাত্যহিক ঝুঁকি নিয়েই পাথর তুলতে নেমে যাই নদীর বরফগলা জলে।

পাথর শ্রমিক ছাড়াও এ নদীর তীরে পাথর নেটিং, শোটিং ও ক্রাশিং এর কাজ করছে শত শত নারী পাথর শ্রমিক। তেঁতুলিয়া থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার নদীর তীরসহ সড়কের উভয় পাশে চলে পাথর লোড-আনলোড, নেটিং, শোটিং ও ক্রাশিংয়ের কাজ। এসব কাজে জড়িত শত শত নারী-পুরুষ শ্রমিক। তারাও ভোর সকালে ঘরের গৃহস্থালি কাজ সেরে হিম কুয়াশার ভেতরেই বের হয়ে যায় কাজের উদ্দেশে। ভোর সকালে যখন কুয়াশা ঢাকা চারপাশ, কনকনে শীতে হাত অবশ হয়ে আসে। কিন্তু সেই অবশ করা ঠান্ডাও হার মানে এসব কর্মজীবী শ্রমিকদের কাছে। অটোভ্যান, অটোরিকশা ও কেউ সাইকেল চালিয়ে যোগ দেয় কাজে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। 

ক্র্যাশিং মেশিনে পাথর ভাঙা কাজে নিয়োজিত জরিনা খাতুন বলেন, ফজরের আযান শুনে ঘুম থেকে উঠতে হয়। তারপর তাড়াহুড়ো করে নিজের ও দুই সন্তানের জন্য রান্না করতে হয়। সন্তানদের কোন দিন খাইয়ে কোন দিন না খাইয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়। দেরি করে কাজে পৌঁছালে মহাজনের গালি শুনতে হয়। কোন কোন দিন দেরি করার কারণে কাজেই নেওয়া হয় না। 

চোখের পানি ফেলে মাগুড়া গ্রামের শেফালি আক্তার বলেন, বছর ছয়েক আগে স্বামী ছেড়ে গিয়ে আরেকটি বিয়ে করেছে। ঘরে দুই মেয়ে। ওদের তো বড় করতে হবে, লেখাপড়া ও বিয়ে দিতে হবে। তাই শীতকে শীত মনে না করে পাথর ভাঙ্গা মেশিনে কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। 

পাথর ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ বলেন, প্রচন্ড শীত, তার মধ্যে বরফের মতো ঠান্ডা মহানন্দার পানি। সকালে শ্রমিকরা পানিতে নেমে দিনভর পাথর তুললে আমরা ব্যবসায়ীরা তাদের থেকে পাথর কিনে নেই। চেষ্টা করি তাদের ন্যায্য দাম দিতে। প্রতিদিন একজন শ্রমিক পাথর তুলে ৫০০/৬০০ টাকা পর্যন্ত আয় করে।

উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুর রহমান ডাবলু বলেন, তেঁতুলিয়া পাথর ও চা শিল্পখ্যাত এলাকা। দুই বাংলার বুক চিরে প্রবাহিত মহানন্দা নদী হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। এ উপজেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি অংশ প্রতিদিন এ নদী থেকে পাথর তুলে জীবিকা নির্বাহ করে। উপজেলা পরিষদের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের মেধাবী সন্তানদের সহযোগিতা করছি। আমরা চেষ্টা করবো প্রচন্ড হাড়কাঁপা শীতে শীতবস্ত্র দিয়ে তাদের উষ্ণতা দিতে।

-এমএ


Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝