Foodpanda-কে ঘিরে চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের অসন্তোষ ও বয়কট কর্মসূচি এখন নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে দেশের রেস্তোরাঁ শিল্পে। উচ্চ কমিশন, অতিরিক্ত চার্জ, অর্থ পরিশোধে বিলম্ব এবং বিভিন্ন ধরনের জরিমানা আরোপের অভিযোগে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ ক্রমেই রূপ নিচ্ছে ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক সংহতি ও ঐক্যের বার্তায়।
বিশেষ করে চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের সম্মিলিত অবস্থানের প্রতি ঢাকাভিত্তিক বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ব্র্যান্ডের সমর্থন বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ব্যবসার অবস্থান ও ব্র্যান্ডের পরিচয় আলাদা হলেও ন্যায্য অধিকার এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার অভিযোগ, Foodpanda-র কমিশন ও বিভিন্ন অতিরিক্ত চার্জের কারণে অনেক রেস্তোরাঁর মুনাফা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। তাদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিশন ও অন্যান্য কর্তন মিলিয়ে বিক্রির বড় একটি অংশ প্ল্যাটফর্মের কাছে চলে যাচ্ছে।
সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছয় দফা দাবির বিষয়ে সন্তোষজনক সাড়া না পাওয়ায় চট্টগ্রামে ইতোমধ্যে অন্তত ১২০টি রেস্তোরাঁ Foodpanda বয়কট করেছে। আরও রেস্তোরাঁ এই কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
চট্টগ্রামের প্রতিবাদ, দেশজুড়ে ঐক্যের বার্তা
চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের এই অবস্থান এখন স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর ব্যবসায়িক সংহতির আলোচনায় পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার যেসব রেস্টুরেন্ট চট্টগ্রামে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তাদের প্রতিও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ন্যায্য দাবির প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ঢাকাভিত্তিক রেস্টুরেন্ট ব্র্যান্ড চিলক্সের অবস্থান। চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের ঐক্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে চিলক্স Foodpanda-তে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
একইভাবে ঢাকার ব্র্যান্ড রোডসাইড কিচেনও চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত অবস্থানের প্রতি সংহতি জানিয়ে Foodpanda-তে কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে বলে জানা গেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, এটি কেবল একটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থের প্রতি দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
তাদের আহ্বান, চট্টগ্রামে ব্যবসা পরিচালনাকারী ঢাকার অন্যান্য রেস্টুরেন্ট ব্র্যান্ডও যেন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ায় এবং সম্মিলিতভাবে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।
উচ্চ কমিশন ও অতিরিক্ত চার্জে সংকটে রেস্তোরাঁ ব্যবসা
রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, Foodpanda-তে কমিশন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রাইডারের অপেক্ষার মাশুল, অনলাইন পেমেন্ট ফি, ভ্যাট এবং অন্যান্য চার্জ।
একটি রেস্তোরাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, Foodpanda-তে ১১টি অর্ডারে মোট বিক্রি হয়েছিল ৭ হাজার ৩৪ টাকা। কিন্তু ডিসকাউন্ট, কমিশন, রাইডারের অপেক্ষার মাশুল ও অন্যান্য কর্তন শেষে রেস্তোরাঁটির হিসাবে জমা হয় মাত্র ৩ হাজার ৫২৪ টাকা ৩৭ পয়সা।
অন্যদিকে, আরেক রেস্তোরাঁর মালিক অভিযোগ করেছেন, গত মাসে ৫ হাজার ৫ টাকা বিক্রির বিপরীতে সব ধরনের চার্জ বাদ দিয়ে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৬৭ টাকা।
রেস্তোরাঁ মালিকদের বক্তব্য, খাবার তৈরির কাঁচামাল, কর্মীদের বেতন, দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটানোর পর এত বেশি কমিশন দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তারা কমিশনসহ সব ধরনের চার্জ সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশে সীমিত রাখা এবং সাত দিনের মধ্যে বিক্রির অর্থ পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন।
Foodpanda-র বিকল্প হিসেবে Pathao Food ও Foodi
Foodpanda বয়কটের পর বিকল্প অনলাইন খাবার সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন অনেক রেস্তোরাঁ মালিক। এ ক্ষেত্রে Pathao Food ও Foodi গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে।
রেস্তোরাঁ মালিকদের দাবি, এসব প্ল্যাটফর্মের কমিশন তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্যবসার খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হচ্ছে।
Foodi-র চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী ব্যবস্থাপক ফয়সাল আহমেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে ৪৫০ থেকে ৫০০টি রেস্তোরাঁ যুক্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের কোনো গোপন চার্জ বা বিলম্ব ফি নেই।
অন্যদিকে, দক্ষিণ খুলশির দ্য পিজ্জা কো ইতোমধ্যে Foodpanda থেকে সরে এসে Foodi ও Pathao Food-এর মাধ্যমে খাবার সরবরাহ কার্যক্রম চালু করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া কিছু রেস্তোরাঁ অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি অর্ডার নিচ্ছে। টেকঅ্যাওয়ে ও নিজস্ব হোম ডেলিভারি ব্যবস্থার দিকেও ঝুঁকছেন উদ্যোক্তারা।
Foodpanda-র বক্তব্য ও পাল্টা অবস্থান
অন্যদিকে Foodpanda বাংলাদেশ জানিয়েছে, প্রতিটি রেস্তোরাঁর সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে তারা ব্যবসা পরিচালনা করে। অংশীদার রেস্তোরাঁগুলোর উদ্বেগ নিরসনে সরাসরি আলোচনা চলছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অর্ডার বাতিলের ক্ষেত্রে নিজস্ব তহবিল থেকে রেস্তোরাঁকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় এবং বাতিল অর্ডারের সরবরাহ ব্যয়ও তারা বহন করে।
এ ছাড়া কিছু রেস্তোরাঁকে Foodpanda-র সার্ভিস ট্যাব বন্ধ রাখতে এবং প্রতিযোগী প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে চাপ দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের আন্দোলন কোনো প্রতিযোগী প্ল্যাটফর্মকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়। বরং রেস্তোরাঁ ব্যবসার স্থায়িত্ব, ন্যায্য কমিশন এবং ব্যবসায়িক অধিকার প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য।
ঐক্যই হোক রেস্তোরাঁ শিল্পের শক্তি
Foodpanda ইস্যুতে চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের অবস্থান দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। একটি শহরের ব্যবসায়িক সমস্যা অন্য শহরের উদ্যোক্তাদেরও ভাবিয়ে তুলতে পারে। কারণ কমিশন, পেমেন্ট, জরিমানা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়গুলো পুরো রেস্তোরাঁ শিল্পের সঙ্গেই জড়িত।
একটি অনলাইন ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের সফলতা শুধু তার ব্র্যান্ড পরিচিতি কিংবা গ্রাহকসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যুক্ত রেস্তোরাঁ মালিকদের মুনাফা, রাইডারদের আয় এবং গ্রাহকদের সন্তুষ্টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, সব প্ল্যাটফর্মই এমন নীতিমালা অনুসরণ করবে, যেখানে কমিশন ও চার্জ হবে স্বচ্ছ, পেমেন্ট হবে নির্ধারিত সময়ে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে উভয় পক্ষের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের এই ঐক্যের বার্তা এখন একটি বৃহত্তর প্রত্যাশার প্রতীক- ব্যবসা হবে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতায় থাকবে ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মান।
ব্র্যান্ড আলাদা হতে পারে, ব্যবসার ধরন আলাদা হতে পারে; কিন্তু ন্যায্য অধিকার ও ব্যবসায়িক মর্যাদার প্রশ্নে সবাই এক।
কারণ ঐক্য কোনো একটি শহরের স্বার্থ নয়, এটি পুরো রেস্তোরাঁ শিল্পের সম্মিলিত শক্তি।