‘গত পরশুও মেয়ে আমার সঙ্গে ঘুমিয়েছে, আজ সে শুধু স্মৃতি। আমি কীভাবে রাতগুলো পার করব?’—একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে এভাবেই বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন শংকর বেপারী। দুর্গাপূজার আনন্দ শেষে যে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সেই আট বছরের অর্পিতা এখন নিথর দেহ। আর নদীতে নিখোঁজ স্ত্রী রিনা বেপারীর অপেক্ষায় দিশাহারা এই বাবা। একদিকে সন্তান হারানোর অসহনীয় শোক, অন্যদিকে স্ত্রীর বেঁচে থাকার ক্ষীণ আশায় কাটছে তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত।
পিরোজপুরের কালীগঙ্গা নদীতে অতিরিক্ত যাত্রী ও ভারী মোটরসাইকেল বোঝাই ট্রলারডুবির ঘটনায় এমনই মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছে শংকর বেপারীর পরিবারের। দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ মা-মেয়ের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে শিশু অর্পিতার মরদেহ। তবে বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল ৯টা ১৩ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেলেনি ৩৯ বছর বয়সী রিনা বেপারীর।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীরামকাঠী-ভরতকাঠী ফেরিঘাট এলাকায় কালীগঙ্গা নদীতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রলারটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রীর পাশাপাশি তোলা হয়েছিল ছয় থেকে আটটি ভারী মোটরসাইকেল। ঘাট ছাড়ার পরপরই ট্রলারটি ডুবে গেলে অধিকাংশ যাত্রী তীরে উঠতে পারলেও নিখোঁজ হন রিনা ও তাঁর মেয়ে অর্পিতা।
‘সবাই তীরে উঠল, আমার স্ত্রী-মেয়ে উঠল না’
মেয়েকে হারিয়ে শোকাতুর শংকর বেপারী বলেন, ‘নৌকাডুবির পর যখন আমার পরিবারের কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন হাসপাতালসহ আশপাশের নদীতে খুঁজেছি। সবাই তীরে উঠলেও ওরা নিখোঁজ রয়ে যায়। এখন মেয়ে মারা গেছে, ওর মাও হয়তো বেঁচে নেই।’
শংকরের এই কথায় ফুটে ওঠে এক অসহায় বাবার বুকভাঙা কষ্ট। যে মেয়েকে ঘিরে ছিল তাঁর স্বপ্ন, সেই মেয়েকে হারিয়ে এখন শূন্য হাতে বাড়ি ফেরার বাস্তবতা। তার ওপর স্ত্রীর কোনো খোঁজ না মেলায় গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর।
অতিরিক্ত বোঝায় ডুবল ট্রলার
প্রত্যক্ষদর্শী ও ট্রলার থেকে বেঁচে ফেরা এক যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, নাজিরপুর প্রান্ত থেকে ভরতকাঠী ফেরিঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা ট্রলারটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী তোলা হয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল অন্তত ছয় থেকে আটটি ভারী মোটরসাইকেল।
ঘাট ছাড়ার পরপরই অতিরিক্ত বোঝার কারণে ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে নদীতে তলিয়ে যায়। মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে বাঁচার আকুতি ও হাহাকার। অধিকাংশ যাত্রী সাঁতরে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় তীরে উঠতে সক্ষম হন। তবে নদীর অন্ধকার পানিতে তলিয়ে যান রিনা ও অর্পিতা।
দুই দফা অভিযান, উদ্ধার শিশুর মরদেহ
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে প্রথমে উদ্ধার অভিযান শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। তবে প্রথম দফায় নিখোঁজ কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরে বরিশাল থেকে ডুবুরি দল এনে দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় উদ্ধার করা হয় নিখোঁজ শিশু অর্পিতার মরদেহ। তবে তাঁর মা রিনার সন্ধান তখনো মেলেনি।
বুধবার সকাল ৯টা ১৩ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ৩৭ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও রিনা বেপারীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে জানান নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ফায়ার ফাইটার মো. পারভেজ।
উদ্ধার অভিযান ও পরিস্থিতি তদারকিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন পিরোজপুর জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক রায়হানুল আশরাফ এবং নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক সোয়াইব হোসেন মুন্সি। এ ছাড়া নাজিরপুর ও নেছারাবাদ থানা-পুলিশের যৌথ দল ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করে।
নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা জানান, তীব্র পানির স্রোতের মধ্যেও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল দুই দফায় অভিযান চালিয়ে শিশু অর্পিতার মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এ ঘটনায় যাঁদের অবহেলা ছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পূজার আনন্দ থেকে পরিবারে শোক
নেছারাবাদ উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়নের ভরতকাঠী গ্রামের বাসিন্দা শংকর বেপারী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করেন। দুর্গাপূজার ছুটিতে তিনি পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। সোমবার রাতে শ্রীরামকাঠীতে প্রতিমা দর্শন ও পূজা শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ট্রলারে বাড়ি ফিরছিলেন।
শংকরের স্ত্রী রিনা বেপারীর বয়স ৩৯ বছর। তাঁদের একমাত্র মেয়ে অর্পিতার বয়স ছিল মাত্র আট বছর। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে বাড়ি ফেরার পথেই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মুহূর্তে বদলে যায় একটি পরিবারের জীবনের গল্প। মেয়েকে হারিয়ে এখন স্ত্রীর অপেক্ষায় দিন গুনছেন শংকর।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে প্রতিমন্ত্রী
দুর্ঘটনার পর মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে শ্রীরামকাঠী ও নেছারাবাদের ভরতকাঠী খেয়াঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মেদ সোহেল মনজুর। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মো. গোলাম রাব্বানী ও পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।
এর আগে দুর্ঘটনাস্থল ও উদ্ধার পরিস্থিতি তদারকিতে সেখানে ছুটে যান নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আহসান হাবিব এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাসরিন জাহান।
দুর্গাপূজার আনন্দ শেষে যে পরিবারটির ঘরে ফেরার কথা ছিল হাসি-আনন্দ নিয়ে, সেখানে এখন নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আট বছরের অর্পিতা আর ফিরবে না। তবু কালীগঙ্গার দিকে তাকিয়ে এখনো অপেক্ষা করছেন শংকর—যদি ফিরে পান তাঁর নিখোঁজ স্ত্রীকে।