প্রতিদিন কম্পিউটারে কাজ করার সময় চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছোট্ট একটি তীরচিহ্ন। ফাইল খোলা, লেখা নির্বাচন কিংবা ওয়েবসাইটে ক্লিক, সবকিছুতেই পয়েন্টারের ভূমিকা থাকে। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, তীরটি সোজা না হয়ে বাঁ দিকে কাত হয়ে থাকে কেন?
এই ছোট্ট নকশার পেছনে রয়েছে কম্পিউটার প্রযুক্তির দীর্ঘ ইতিহাস, যার শুরু ষাটের দশকে।
১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার বিজ্ঞানী ডগলাস এঙ্গেলবার্টের দলের প্রকৌশলী বিল ইংলিশ তৈরি করেন মাউসের প্রথম কার্যকর নমুনা। ১৯৬৮ সালের ৯ ডিসেম্বর এঙ্গেলবার্টের ঐতিহাসিক প্রদর্শনীতে মাউসসহ কম্পিউটারের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের নতুন পদ্ধতি তুলে ধরা হয়। তখনকার পয়েন্টার ছিল সোজা ওপরমুখী তীর।
এরপর সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের জেরক্স পিএআরসি গবেষণাকেন্দ্রে গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেসের উন্নয়ন শুরু হয়। সীমিত রেজল্যুশনের পর্দায় পিক্সেল দিয়ে স্পষ্ট তীর তৈরি করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষকেরা এমন একটি নকশা গ্রহণ করেন, যেখানে তীরের এক পাশ সোজা এবং অন্য পাশ তির্যক। এতে কম পিক্সেলেও তীরের মাথা স্পষ্ট রাখা সম্ভব হয়। পাশাপাশি, পর্দার কোনো উপাদান নির্দেশ করার সময় তীরের শরীর যেন সেটিকে অতিরিক্ত আড়াল না করে, সেটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।
১৯৮১ সালে জেরক্স স্টার, ১৯৮৩ সালে অ্যাপল লিসা এবং ১৯৮৪ সালে ম্যাকিনটোশের মাধ্যমে মাউসনির্ভর গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরে মাইক্রোসফট উইন্ডোজেও একই ধরনের তীরচিহ্ন ব্যবহৃত হয়। এভাবেই একটি নকশা ধীরে ধীরে কম্পিউটারের সর্বজনপরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়।
তীরটি কেন বাঁ দিকেই কাত, তার পেছনে কেবল একটি নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে কিছু অনুমান করা যায়না। তবে সীমিত পিক্সেলে স্পষ্ট আকৃতি তৈরি এবং নির্দিষ্ট জায়গায় নির্ভুলভাবে নির্দেশ করার সুবিধা এর নকশার গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।
আজকের উচ্চ রেজল্যুশনের পর্দায় সেই পুরোনো সীমাবদ্ধতা আর নেই। তবু পয়েন্টার হারিয়ে যায়নি। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো হাত, কখনো সরু রেখা, আবার কখনো বৃত্তাকার চিহ্নে রূপ নেয়। ২০২০ সালে অ্যাপল আইপ্যাডে এমন একটি বৃত্তাকার পয়েন্টার চালু করে, যা বিভিন্ন ইন্টারফেস উপাদানের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারত।
তবু প্রচলিত তীরের জনপ্রিয়তা রয়ে গেছে। কারণ প্রযুক্তি বদলালেও পরিচিত নকশার ব্যবহারিক সুবিধা ও মানুষের অভ্যাস সহজে বদলায় না।
পরেরবার কম্পিউটারে ক্লিক করার সময় তীরটির দিকে একটু খেয়াল করুন। এটি নিছক একটি চিহ্ন নয়; বরং প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন এক নকশার স্মারক, যা পুরোনো পর্দার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আজও কোটি মানুষের দৈনন্দিন কাজে অপরিহার্য হয়ে আছে।
এসএস