পিরোজপুরের জিয়ানগরে গভীর রাতে আগুনে পুড়েছে তরুণ উদ্যোক্তা সোলাইমান হোসেনের খাবার হোটেল। পরিবারের আট সদস্যের ভরণপোষণ ও নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর একমাত্র অবলম্বন ছিল হোটেলটি। আগুনে পুড়ে গেছে নগদ টাকা, ফ্রিজসহ সবকিছু। পাশের একটি ওষুধের দোকানেরও অধিকাংশ পুড়ে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বসতঘর। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এর আগেও হোটেলটিতে একাধিকবার আগুন দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এবার পুরো হোটেল পুড়ে যাওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ।
একটি ছোট খাবার হোটেলই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন। সেই হোটেলের আয় দিয়ে নিজের পড়াশোনা চালানোর পাশাপাশি পরিবারের আট সদস্যের মুখে খাবার তুলে দিতেন তরুণ উদ্যোক্তা সোলাইমান হোসেন। কিন্তু গভীর রাতে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তাঁর সেই একমাত্র সম্বল। নিঃস্ব হয়ে এখন দিশেহারা এই শিক্ষার্থী। কীভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াবেন, কীভাবে চলবে সংসার—জানা নেই তাঁর।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ২টার দিকে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার ঘোষেরহাট বাজারে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে সোলাইমানের খাবার হোটেলটি পুরোপুরি পুড়ে যায়। পাশের মো. কামাল হোসাইনের ওষুধের দোকানেরও অধিকাংশ ওষুধ পুড়ে নষ্ট হয়েছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাশের সাবিনা আক্তারের বসতঘরও।
রোববার (১৮ অক্টোবর) খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী ও জিয়ানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. ওয়ালিউর রহমান রুবেল।
‘আমার একমাত্র সম্বল ছিল হোটেলটি’
স্থানীয় সরকারি ইন্দুরকানী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সোলাইমান হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘খাবার হোটেলের আয় দিয়ে আমার পড়াশোনা ও পরিবারের খরচ চালাতাম। দুর্বৃত্তরা এর আগেও পাঁচ-ছয়বার আগুন লাগিয়েছিল, কিন্তু সফল হতে পারেনি। এবার হোটেলে থাকা নগদ টাকা, ফ্রিজসহ সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার একমাত্র সম্বল ছিল এটি। আমি এখন কী করব, বুঝে উঠতে পারছি না।’
সোলাইমানের দাবি, এর আগেও তাঁর হোটেলে একাধিকবার আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এবার আগুনে হোটেলটি সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ায় তাঁর আয়ের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে, ছড়িয়ে পড়ে আগুন
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত আড়াইটার দিকে বিকট শব্দ শুনে কয়েকজনের ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে বেরিয়ে তাঁরা দোকানে আগুন জ্বলতে দেখেন। তাঁদের ডাক-চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। পরে খবর দেওয়া হলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
তবে ততক্ষণে সোলাইমানের খাবার হোটেলটি পুরোপুরি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পাশের ওষুধের দোকানটিরও অর্ধেক পুড়ে যায় বলে ক্ষতিগ্রস্তরা জানান।
‘পেট্রলের গন্ধ পেয়েছি’, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ
ঘোষেরহাট বাজারের ব্যবসায়ী মো. আল আমিন অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর থেকে বাজারে কোনো কমিটি নেই। ফলে বাজারটি অভিভাবকহীন অবস্থায় চলছে। বাজারের সিসি ক্যামেরাগুলোও ঠিক নেই। এ ছাড়া বাজারের ভেতরের রাস্তার দুই পাশে টং দোকান বসানো হয়েছে এবং ওপরে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। এতে জরুরি মুহূর্তে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে এই বাজারে একটি দোকান পরিকল্পিতভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার সোলাইমানের দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হলো। তাঁর দাবি, এর আগেও দোকানটিতে চারবার আগুন লাগানো হয়েছিল। এবার দোকানটির ওপর পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা গন্ধ পেয়েছেন। ঘটনাটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আল আমিন বলেন, ‘ছেলেটির বাবা ছোটবেলায় মারা গেছেন। পরিবারের সব খরচ তাকেই চালাতে হয়। দুর্বৃত্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’
আগুনের আতঙ্ক পাশের বাড়িতেও
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সাবিনা আক্তার বলেন, রাত ২টার পর হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে ঘরের দরজা খুলে দেখেন, দোকানে আগুন জ্বলছে। পরে সেই আগুন তাঁদের বসতঘরেও ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ও তাঁর পরিবারের চার-পাঁচজন সদস্য মিলে পানি দিয়ে আগুন নেভাতে সক্ষম হন।
সাবিনা আক্তার বলেন, ‘আমি ভয়ে আছি, আবারও যদি কেউ এভাবে আগুন লাগিয়ে দেয়। আমরা জীবনের নিরাপত্তা চাই।’
অন্যদিকে ওষুধের দোকানের মালিক মো. কামাল হোসাইন বলেন, তাঁর দোকানের অধিকাংশ ওষুধ পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো সহযোগিতা পেলে তিনি আবারও ব্যবসা শুরু করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
সরু রাস্তা ও অবৈধ স্থাপনায় বাধাগ্রস্ত ফায়ার সার্ভিস
জিয়ানগর উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত) নুরুজ্জামান শরিফ বলেন, খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভাতে সক্ষম হন। তবে বাজারের দুই পাশে দোকানের সামনে টুল থাকায় গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা বিলম্ব হয়। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত করে জানানো যাবে।
জিয়ানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. ওয়ালিউর রহমান রুবেল বলেন, খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বাজারের রাস্তা সরু হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারছিল না। রাস্তার দুই পাশে কিছু অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। পরে সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সোলাইমানসহ ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
এ বিষয়ে জিয়ানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান বলেন, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এফএস