পিরোজপুরের দুর্গাপুর গ্রামে একসময় অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। সেই গ্রামের চিত্র এখন বদলে গেছে হাঁসের খামারে। খাল-বিল আর প্রাকৃতিক জলাশয়কে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক হাঁসের খামার। প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে হাজার হাজার ডিম। হাঁসের ডিম ও বাচ্চা বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন বহু পরিবার। এসএসসি পরীক্ষার পর মাত্র ৫০টি হাঁস দিয়ে শুরু করা সায়েম হাওলাদারের খামারে এখন হাঁসের সংখ্যা প্রায় ৮০০। তবে ডিমের দাম কমে যাওয়া, ওষুধ ও খাবারের বাড়তি খরচ এবং আধুনিক চিকিৎসাসেবার অভাবে সম্ভাবনাময় এই খাত নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন খামারিরা।
খাল-বিলের গ্রামে হাঁস পালনের বিস্তার
পিরোজপুর শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত দুর্গাপুর গ্রাম। চারদিকে খাল-বিল, নালা ও প্রাকৃতিক জলাশয় থাকায় হাঁস পালনের জন্য উপযোগী পরিবেশ রয়েছে এখানে। এই প্রাকৃতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিকভাবে হাঁস পালন শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে খামারের সংখ্যা। একপর্যায়ে গ্রামটি পিরোজপুর জেলায় পরিচিতি পায় ‘হাঁসের গ্রাম’ হিসেবে।
গ্রামজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক হাঁসের খামার। এসব খামারে প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে হাজার হাজার ডিম। ডিম ও হাঁসের বাচ্চা বিক্রি করে আয় করছেন খামারিরা। স্থানীয়ভাবে এসব বিক্রির মাধ্যমে প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে জানা গেছে। অনেক খামারির মাসিক নিট আয় লাখ টাকারও বেশি।
৫০ হাঁস দিয়ে শুরু, এখন খামারে ৮০০
দুর্গাপুর গ্রামের সফল খামারিদের একজন সায়েম হাওলাদার। এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে হাঁস পালনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শুরুতে মাত্র ৫০টি হাঁস নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ধীরে ধীরে বড় করেছেন খামার।
বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে প্রায় ৮০০ হাঁস। নিবিড় পরিচর্যা ও নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে খামারটি বড় করেছেন তিনি।
সায়েম হাওলাদার বলেন, পরীক্ষার পর বসে না থেকে অল্প কিছু হাঁস দিয়ে শুরু করেছিলাম। হাঁসগুলো মুক্ত জলাশয়ে চরে বেড়ায়। ফলে অতিরিক্ত কৃত্রিম খাবারের খরচ অনেক কম হয়। বর্তমানে ডিম ও বাচ্চা বিক্রি করে আমি পুরোপুরি স্বাবলম্বী। পরিবারের খরচ চালানোর পাশাপাশি ভালো অঙ্কের টাকা সঞ্চয়ও করতে পারছি।
হাঁস পালনে স্বাবলম্বী দুই শতাধিক খামারি
সায়েম হাওলাদারের মতো দুর্গাপুর গ্রামের জোবায়ের, শফিক ও আরিফসহ দুই শতাধিক খামারি হাঁস পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। একসময় যাঁদের সংসারে অভাব-অনটন ছিল, তাঁদের অনেকেই এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।
হাঁস পালন শুধু তাঁদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনই ঘটায়নি, স্থানীয়ভাবে অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছে। প্রাকৃতিক জলাশয় ও সহজলভ্য খাবারের সুবিধা কাজে লাগিয়ে হাঁস পালন এখন গ্রামটির অন্যতম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।
ডিমের দাম কম, বাড়ছে উৎপাদন খরচ
হাঁস পালন করে সচ্ছলতা এলেও খামারিদের দুশ্চিন্তা কমছে না। স্থানীয় খামারিরা জানান, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর বাজারে ডিমের দাম কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে হাঁসের ওষুধ ও সম্পূরক খাদ্যের দাম ক্রমেই বাড়ছে।
উৎপাদিত ডিমের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় গত বছরের তুলনায় তাঁদের মুনাফা কমেছে। এতে অনেক খামারিকে আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। ডিমের দাম ও উৎপাদন খরচের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় খামার পরিচালনা নিয়েও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবার অভাবে ঝুঁকিতে খামার
দুর্গাপুরের খামারিদের বড় উদ্বেগ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসাসেবার অভাব। বাণিজ্যিকভাবে এত বড় পরিসরে হাঁস পালন করা হলেও আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খামার পরিচালনার সুযোগ সীমিত বলে অভিযোগ তাঁদের।
খামারিরা জানান, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খামারে বিভিন্ন রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এলাকায় আধুনিক প্রাণিচিকিৎসা কেন্দ্র ও পর্যাপ্ত চিকিৎসাসুবিধা না থাকায় অনেক সময় দ্রুত রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। এতে হঠাৎ হাঁস মারা গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তাঁদের।
খামারিদের দাবি, সময়মতো সরকারি প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম এবং খামারের কাছাকাছি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে খামার ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা পাওয়া যাবে।
পিরোজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তরুণ কুমার সিকদার বলেন, দুর্গাপুরের খামারিদের সাফল্য পিরোজপুরের সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য বড় এক অনুপ্রেরণা।
এফএস