আবরার ফাহাদ, সাত খুন কিংবা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা—এ ধরনের আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ক্ষত শুধু ভুক্তভোগী পরিবার নয়, রাষ্ট্রকেও বহন করতে হয়। এসব মামলার দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর করা গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অর্থ শুধু অপরাধীর সাজা নয়, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পান, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি বলেছেন, ফৌজদারি মামলায় রাষ্ট্রই বাদী। তাই আলোচিত হত্যা মামলাগুলোকে শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর বিচারপ্রাপ্তির বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন তিনি।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমরাও তো সমাজের মানুষ, আমরাও এ মাটির সন্তান। আমরাও যে চোখ-কান খোলা রাখি না, তা নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে তার প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হওয়া উচিত। ন্যায়বিচার কিন্তু একপক্ষীয় নয়, এটি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়।’
আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার রাষ্ট্রেরও দায়
সাত খুন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার প্রসঙ্গ তুলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এসব ঘটনায় শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষতি হয়নি, রাষ্ট্রেরও ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ফৌজদারি অপরাধের মামলায় বাদী রাষ্ট্র। ফলে আবরার ফাহাদের পরিবার, সাত খুনের মামলার বাদীপক্ষ কিংবা মেজর সিনহার পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার বিষয়টি কেবল তাদের ব্যক্তিগত লড়াই হিসেবে দেখলে চলবে না। দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আলোচিত এসব মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়া এবং রায় কার্যকর করা গেলে তা অপরাধ দমনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার বক্তব্যে উঠে আসে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধেও রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
মামলা শুনানিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেন, বিভিন্ন বাস্তবতায় সব মামলা ধারাবাহিকভাবে বা সিরিয়াল অনুযায়ী শুনানি করা সম্ভব হয় না। বিচারকের সংকট রয়েছে, অন্যদিকে মামলার জটও অনেক বড়।
তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিচারপ্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হতে হবে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। প্রকৃত অপরাধী যেন তার অপরাধের সাজা পান, আবার কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন শাস্তির মুখে না পড়েন- এ নীতিতে অটল থাকার কথা জানান তিনি।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘বিচারটা এমনভাবে স্বচ্ছভাবে হওয়া উচিত, যাতে যিনি অপরাধী, তিনি প্রকৃতপক্ষে তার অপরাধের সাজা ভোগ করেন, আর নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হাসিমুখে আদালতের ডক থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। এই নীতিতে আমরা সব সময় অটল।’
আপিল বিভাগে বিচারক সংকট, প্রয়োজন বিবেচনার তাগিদ
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারকের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অতীতে আপিল বিভাগে যতসংখ্যক বিচারপতি ছিলেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেই। তবে তার আইনজীবী জীবনের শুরুর দিকে আপিল বিভাগে মাত্র তিনজন বিচারপতিও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সময়ের পরিবর্তন ও বিচারিক কাজের প্রয়োজন বিবেচনায় বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণের বিষয়টি দেখতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য আরও বিচারপতি প্রয়োজন- এ কথা স্বীকার করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কতজন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন এবং কী প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়। এ বিষয়ে সংবিধানে বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের পক্ষে আইনি সহায়তা দেওয়া এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকদের আইনি স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখা।
সব মিলিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যে উঠে এসেছে, বিচারপ্রক্রিয়ায় গতি আনা যেমন জরুরি, তেমনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখাও অপরিহার্য। কারণ, ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পায়, যখন অপরাধী শাস্তি পান এবং নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি থেকে সুরক্ষা পান।