ধানের সোনালি শীষে সজ্জিত দুর্গাপ্রতিমায় শিল্প, সংস্কৃতি ও কৃষিভিত্তিক বাংলার ঐতিহ্যকে এক সুতোয় গেঁথে খুলনায় সৃষ্টি হয়েছে শারদীয় উৎসবের ভিন্নধর্মী আবহ। খুলনা মহানগরীর বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরে প্রচলিত সাজসজ্জার বাইরে গিয়ে চিনিগুঁড়া ধানের শীষ দিয়ে প্রতিমা অলংকরণ করা হয়েছে। ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ দুর্গোৎসবে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
সোনালি ধানের নান্দনিক বিন্যাসে প্রতিমার সাজে ফুটে উঠেছে বাংলার কৃষকের শ্রম, ফসলের সমৃদ্ধি ও গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা আবহ। ব্যতিক্রমী এ প্রতিমা দেখতে মণ্ডপে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। আয়োজকদের দাবি, খুলনা মহানগরীর সার্বজনীন পূজামণ্ডপগুলোর মধ্যে এমন আয়োজন এবারই প্রথম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছরই এখানে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। তবে ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিমার সঙ্গে সিংহের গর্জনের ব্যবস্থা করে ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়েছিল, যা সে সময় দর্শনার্থীদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল।
এবারের পূজায় মণ্ডপটির প্রধান আকর্ষণ চিনিগুঁড়া ধানের শীষে সজ্জিত দুর্গাপ্রতিমা। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিমা তৈরিতে ৩০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান ব্যবহার করা হয়েছে। চারজন শিল্পী প্রায় ৪০ দিন ধরে নিপুণ হাতে প্রতিমাটি তৈরি করেছেন। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
ধানের শীষ দিয়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন প্রতিমাটি দর্শনার্থী ও ভক্তদের কাছে বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই প্রতিমাটি দেখতে ভিড় করছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এ আয়োজন নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল ও উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্যরা জানান, খুলনা মহানগরীতে প্রায় ৭০টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। এর মধ্যে বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরে ধানের শীষ দিয়ে প্রতিমা সাজানোর এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পূজা পরিচালনা কমিটির এক সদস্য বলেন, “আমাদের মণ্ডপে এবার চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। খুলনা শহরের প্রায় ৭০টি মণ্ডপের মধ্যে আমাদের আয়োজনটি ব্যতিক্রমী। তরুণ প্রজন্ম, মন্দির কমিটি ও পূজা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সবার অক্লান্ত পরিশ্রম ও সহযোগিতায় এই প্রতিমা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ এই আয়োজনের কারণে এবার আমাদের মণ্ডপ আরও জমজমাট হয়ে উঠেছে। আমরা সবাইকে সপরিবারে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”
মন্দির কমিটি ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর প্রচলিত রীতিতে প্রতিমা তৈরি করা হলেও এবার দর্শনার্থী ও এলাকাবাসীর আগ্রহের কথা বিবেচনা করে ব্যতিক্রমী কিছু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্য সুব্রত সরকার বলেন, “সবাই বলতেন, আপনারা এবার একটু ব্যতিক্রমী কিছু করুন। সবার মন জয় করতেই এবার ধানের প্রতিমা তৈরি করেছি। এটি তৈরি করতে প্রায় এক মাস ১০ দিন সময় লেগেছে। প্রতিমাটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতির কথা মাথায় রেখে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করছি।”
মন্দির পরিচালনা কমিটির প্রবীণ সদস্য পিন্টু কুমার বিশ্বাস বলেন, “আমাদের এই তেঁতুলতলার প্রাচীন মন্দিরে ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে সিংহের গর্জনের ব্যবস্থা করেছিলাম। আর এবার তৈরি করেছি ধানের প্রতিমা। এটি দেখে দর্শনার্থী থেকে শুরু করে ছোট-বড় সবাই আনন্দিত। দর্শনার্থীদের অভূতপূর্ব সাড়া ও উৎসাহ পেয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।”
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জনজীবনে ধানের গুরুত্ব অপরিসীম। মাঠে পাকা ধানের শীষ দুলতে শুরু করলে কৃষকের ঘরে ঘরে নতুন আশার সঞ্চার হয়। মণ্ডপে দেবী দুর্গার সাজে সোনালি ধানের ব্যবহারও বাংলার মাটি, কৃষি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্ককে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
আধুনিকতার প্রভাবে কিছুটা আড়ালে চলে যাওয়া কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যকে মণ্ডপে জীবন্ত করে তোলার এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের কাছে কৃষিসংস্কৃতি ও লোকজ শিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরছে। সব মিলিয়ে, ধানের শীষে সজ্জিত দুর্গাপ্রতিমাটি কেবল একটি নান্দনিক শিল্পকর্ম নয়; এটি বাংলার কৃষি, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার এক অনন্য প্রকাশ।
এসএস/আরএন