সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার চেলা নদীর তীর কেটে অবাধে চলছে বালু উত্তোলন। তবে পরিবেশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থ রক্ষায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে যাঁরা সোচ্চার, উল্টো তাঁদেরই আসামি করে মামলা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রভাবশালী বালু উত্তোলনকারী চক্র দিনরাত বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন ও সরবরাহ করলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে দু-একজন শ্রমিককে আটক করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে মূল সিন্ডিকেট। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি এসব অভিযান ও মামলার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে যাঁরা প্রতিবাদ করছেন, কৌশলে তাঁদেরই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে মামলায় জড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্র প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে নিরপরাধ শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও প্রতিবাদী বাসিন্দাদের মামলার আসামি করছে। ফলে একদিকে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে আইনি হয়রানির আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। অভিযোগের তালিকায় শিক্ষক থেকে শুরু করে দিনমজুর পর্যন্ত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সর্বশেষ গত ৬ সেপ্টেম্বর সোনাপুর ও পূর্ব সোনাপুরের মরা চেলা নদী এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা করা হয়। দোয়ারাবাজার থানায় মামলাটি দায়ের করেন পরিবেশ অধিদপ্তর, সুনামগঞ্জের সহকারী পরিচালক মো. মুহাইমিনুল হক। পরিদর্শন ও স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়ায় মামলাটি করা হয়েছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি ভিন্ন। তাঁদের অভিযোগ, বেশ কিছুদিন ধরে ইজারাদারের প্রত্যক্ষ মদদে সোনাপুর ও পূর্ব সোনাপুর এলাকায় চেলা নদীর তীর কেটে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ কাজে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পদধারী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত বলে অভিযোগ তাঁদের। ছাতক ও দোয়ারাবাজারের বিভিন্ন দপ্তরের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে এসব কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের পর প্রশাসন অভিযান চালালেও মামলায় প্রকৃত দায়ীদের পরিবর্তে নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করা হচ্ছে। এতে সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষ আইনি জটিলতায় পড়ছেন। অন্যদিকে, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিরা সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মামলার আসামি সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ জানান, তিনি একটি মাদ্রাসার নিয়মিত শিক্ষক। পাশাপাশি স্থানীয় ইছামতী বাজারে তাঁর একটি ফার্মেসি রয়েছে। শিক্ষকতার বাইরে অবসর সময়ে তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে দোকানে সময় দেন। নদী থেকে বালু উত্তোলনের সঙ্গে তাঁর বা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে তিনি বলেন, তাঁকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় আসামি করে হয়রানি করা হচ্ছে।
একই গ্রামের বাসিন্দা জহুর মিয়া বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়ের করা মামলার অধিকাংশ আসামিই নিরপরাধ বলে তিনি মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষকসহ অনেককে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তিনি নিরপরাধ ব্যক্তিদের আইনি হয়রানি থেকে মুক্তি এবং বালু উত্তোলনের সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, নদী থেকে উত্তোলিত বালু কয়েক কিলোমিটার দূরে বড় বড় বাল্কহেডে এবং বিভিন্ন ডাম্পিং পয়েন্টে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। এসব স্থানে বিপুল পরিমাণ বালু প্রকাশ্যে মজুত থাকলেও সেখানে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁদের। ফলে বালুর প্রকৃত ব্যবসায়ী ও মজুতকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সোনাপুর ও পূর্ব সোনাপুর এলাকায় মরা চেলা নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, এই চক্রে রয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সৈকত আলী, মোহাম্মদ আলী ও সুজন মিয়া; নরসিংপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হাজী স্বপন মিয়া ও ফয়েজ উদ্দিন মেম্বার; ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হাজী বুলবুল আহমদ ও হাজী জহির মিয়া। তাঁদের সঙ্গে একই বলয়ে নরসিংপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতা ছেনু মিয়া, আব্দুন নুর, লায়েক মিয়া ও দেলোয়ার হোসাইন যুক্ত রয়েছেন বলেও দাবি করেন তাঁরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা হাজী বুলবুল ও হাজী জহিরের পক্ষ হয়ে বালু উত্তোলনের কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য শাখাওয়াত হোসেন কবির, বাবুল মিয়া, শফিকুল ইসলাম, মিলন মিয়া, শাহিন মিয়া ও কবির মিয়া। অন্যদিকে, হাজী স্বপন মিয়ার সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম নুরু, দোয়ারাবাজার উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুবুল হক শামীম, ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য ইব্রাহিম আলী, রায়হান মিয়া ও হেলাল আহমদ। এ ছাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ফয়েজ উদ্দিন মেম্বার, আব্দুন নুর, মত্তই মিয়া, কামাল মিয়া, সিরাজ মিয়া, আজিজুর রহমান ও মকসুদ রহমানের নামও তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
সৈকত মিয়া ও মোহাম্মদ আলীর সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বশির কোম্পানির হয়ে স্বপন মিয়া, মাসুক মিয়া, দেলোয়ার হোসেন ও কুদ্দুস মিয়া কাজ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া খুর্শেদ আলম ও লায়েক মিয়ার গ্রুপের সঙ্গে ইয়াকুব আলী, জালাল মিয়া ও আজাদ মিয়া বালু উত্তোলনে জড়িত বলে দাবি স্থানীয়দের। ছেনু মিয়ার গ্রুপের হয়ে আব্দুন নুর, মাসুক মিয়া, হিরন মিয়া, শফিক মিয়া ও মিলন মিয়া কাজ করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা মাহবুবুল হক শামীম। তিনি বলেন, তিনি সব সময় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে এসেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানের খবর আগেই পেয়ে যান বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিরা। ফলে তাঁরা সহজেই ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যেতে পারেন, আর সেখানে থাকা শ্রমিকেরা আটক হন। অভিযান শেষ হলে আবারও আগের মতো বালু উত্তোলনের কার্যক্রম শুরু হয় বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শুধু শ্রমিক বা দিনমজুরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ কার্যক্রমের পেছনে যাঁরা অর্থায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে বালু মজুতের স্থানগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, সুনামগঞ্জের সহকারী পরিচালক মো. মুহাইমিনুল হক জানান, স্থানীয়দের দেওয়া অভিযোগ ও সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। এজাহারে উল্লেখিত ব্যক্তিদের বাইরেও তদন্তে অন্য কারও বালু উত্তোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে চার্জশিটে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এমবি/আরএন