
সংগৃহীত ছবি
আজ ১১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা নিশ্চিত করা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সহিংসতা থেকে সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। একটি সুন্দর, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়ে তুলতে কন্যাশিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে দিবসটিতে
একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য নিরাপদ পরিবেশ, পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক বিকাশের সুযোগ প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্বের বহু দেশে এখনো কন্যাশিশুরা নানা ধরনের বৈষম্য, নির্যাতন, বাল্যবিবাহ ও শিক্ষাবঞ্চনার শিকার হচ্ছে। পারিবারিক ও সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক মেয়ে তাদের সম্ভাবনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এসব বাধা দূর করে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০১২ সাল থেকে প্রতিবছর ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালিত হয়ে আসছে। কন্যাশিশুদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা, তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
শিক্ষাই পারে বদলে দিতে কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ
কন্যাশিশুর ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার শিক্ষা। শিক্ষার সুযোগ পেলে একটি মেয়ে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে, আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যতে পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অথচ দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তাহীনতা এবং বাল্যবিবাহের কারণে অনেক মেয়ের শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যায়।
কন্যাশিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ে নিরাপদ পরিবেশ, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ এবং ঝরে পড়া রোধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাল্যবিবাহ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে কন্যাশিশুর উন্নয়নের পথে বাল্যবিবাহ অন্যতম বড় বাধা। অল্প বয়সে বিয়ে হলে মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তারা শারীরিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়ে এবং নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা হারায়।
দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তার উদ্বেগ, প্রচলিত কুসংস্কার এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের অনিশ্চয়তা বাল্যবিবাহের পেছনে ভূমিকা রাখে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পরিবারকে সহায়তা এবং মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।
নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি
কন্যাশিশুরা বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও অনলাইন পরিসরেও বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবারকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাও প্রয়োজন। কন্যাশিশুকে দুর্বল বা পরিবারের বোঝা হিসেবে না দেখে সমান অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব
কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করার প্রথম পদক্ষেপ শুরু হতে পারে পরিবার থেকেই। ছেলে ও মেয়ের জন্য সমান খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। মেয়েদের খেলাধুলা, বিজ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
সমাজের জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যম এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বা বাল্যবিবাহের ঘটনা দেখেও নীরব না থেকে আইনসম্মত ও নিরাপদ উপায়ে প্রতিরোধে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলুক
কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি দেশের টেকসই উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। মেয়েরা শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেলে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন ও নেতৃত্বসহ সব ক্ষেত্রেই অবদান রাখতে পারে। তাই কন্যাশিশুর পেছনে বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নে বিনিয়োগ।
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের মূল বার্তা হলো কোনো মেয়ে যেন জন্মপরিচয় বা লিঙ্গের কারণে পিছিয়ে না পড়ে। প্রতিটি কন্যাশিশু যেন নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পায়। শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, সারা বছর কন্যাশিশুর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হোক এ দিবসের অঙ্গীকার।
দিবসটির ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য হলো “বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন, কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করুন!”
এফএস