রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে বেশি ঘনিষ্ঠ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও পারমাণবিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ইরানের রাজধানী তেহরানে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি এ মন্তব্য করেন। বৈঠকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি লেবানন, ফিলিস্তিন, ইউক্রেন ও ইয়েমেন নিয়ে আলোচনা হয়।
আরাগচি বলেন, ‘আমাদের ইতিহাসে কখনোই ইরান ও রাশিয়া বর্তমান সময়ের মতো এত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেনি।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে সময়োপযোগী আলোচনা হয়েছে এবং অর্থনৈতিক ও পারমাণবিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সহযোগিতা
বৈঠকে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ল্যাভরভ বলেন, বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগসংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসবে না মস্কো।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেও বাণিজ্য বেড়েছে ১০ শতাংশের বেশি। ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের (ইএইইউ) সঙ্গে ইরানের মুক্তবাণিজ্য চুক্তিও এ প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
পারমাণবিক জ্বালানি খাতে দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম কেন্দ্র ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ল্যাভরভ জানান, রুশ বিশেষজ্ঞরা ধীরে ধীরে ওই কেন্দ্রে ফিরে যাচ্ছেন। এ ছাড়া জ্বালানি খাতে যৌথ উদ্যোগ এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও দুই দেশের মধ্যে কাজ চলছে।
২০ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব
ইরান ও রাশিয়ার সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। ওই মাসে মস্কোয় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিটি ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর কার্যকর হয়।
এতে জ্বালানি, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, পরিবহন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর কাঠামো রাখা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেও যৌথ উদ্যোগের কথা রয়েছে। তবে চুক্তিটিতে কোনো দেশ আক্রান্ত হলে অপর দেশকে সরাসরি সামরিকভাবে যুদ্ধে অংশ নিতে হবে এমন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা নেই।
হরমুজ প্রণালি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
বৈঠকে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুত্ব পায়। আরাগচি হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ও নিরাপত্তাহীনতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন।
ল্যাভরভও উপসাগরীয় অঞ্চলে সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁর প্রস্তাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি ইরানের অংশগ্রহণ, সামরিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে আস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় ফিলিস্তিন, লেবানন, ইয়েমেন ও ইউক্রেনের পরিস্থিতিও উঠে আসে। দুই দেশের কর্মকর্তারা আঞ্চলিক সংকট নিরসনে কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে সমন্বয় অব্যাহত রাখার বিষয়ে আলোচনা করেন। ব্রিকস, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) ও ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের মতো বহুপক্ষীয় কাঠামোয় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে ছিল।
মস্কোর বৃহত্তর কৌশলগত হিসাব
ইরান ও রাশিয়া উভয় দেশই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধের মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাণিজ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও আর্থিক লেনদেনে সহযোগিতা বাড়ানো দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও সব আঞ্চলিক ইস্যুতে তাদের স্বার্থ অভিন্ন , এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ল্যাভরভের তেহরান সফরের আগে তিনি বাহরাইনে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ফলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ ধরে রাখার রুশ প্রচেষ্টা সফরটির কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
আরাগচির বক্তব্য দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরলেও, পারমাণবিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও পরিবহন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতিই শেষ পর্যন্ত এই অংশীদারত্বের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে। বিশেষ করে বুশেহর বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি এবং উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডর উন্নয়নের অগ্রগতি থাকবে পর্যবেক্ষকদের নজরে।
এফএস