আবাসন সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৪০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় সোমবার (৫ অক্টোবর) ওমানের রাজধানী মাসকাটে বিভিন্ন দেশের সরকার, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনের প্রতিনিধিরা বৈঠক করেছেন। বিশ্ব আবাসন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ বৈঠক থেকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ বছর বিশ্ব আবাসন দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’।
টেকসই নগরায়ণ নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা ইউএন-হ্যাবিট্যাটের নির্বাহী পরিচালক আনাক্লাউদিয়া রসবাখ বলেন, পর্যাপ্ত আবাসন কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও টেকসই নগর গড়ে তোলার ভিত্তি।
তিনি বলেন, আবাসনকে ভূমি ও মৌলিক সেবার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সরকার, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশ্ব আবাসন দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসনকে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুযোগের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ৩০০ কোটিরও বেশি মানুষ এই সার্বজনীন মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত।
গুতেরেস বলেন, ১০০ কোটির বেশি মানুষ অস্থায়ী বসতি ও বস্তিতে বাস করেন। আরও অনেকে গৃহহীন অথবা সংঘাত, দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত।
দারিদ্র্যের ফাঁদ
জাতিসংঘের হ্যাবিট্যাট অ্যাসেম্বলির সভাপতি নাগা কোর মিং বলেন, পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে মানুষের বাস্তব জীবন।
একই সঙ্গে আইনি সুরক্ষা ছাড়াই বসবাস করছে কিংবা যাদের ঘরে মৌলিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও বিশুদ্ধ পানিরও সুবিধা নেই এমন পরিবারগুলোর দুর্দশার কথা তুলে ধরেন মালয়েশিয়ার আবাসন ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মিং। এসব পরিবারের শিশুরা প্রতিরোধযোগ্য বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপত্তা বা আইনি নিশ্চয়তা ছাড়া একটি বাড়ি কোনো ঘর নয়। এটি দারিদ্র্যের ফাঁদ। সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত করতে দ্রুত সমাধানের পরিবর্তে কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে যেতে হবে।
ইউএন-হ্যাবিট্যাটের নির্বাহী পরিচালক রসবাখ বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামো অনুযায়ী কোনো আবাসনকে পর্যাপ্ত বলে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে সাতটি মানদণ্ড রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৌলিক সেবার প্রাপ্যতা, বসবাসের উপযোগিতা, সামর্থ্যের মধ্যে থাকা, অবস্থান ও সহজে প্রবেশাধিকার।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত আবাসন বলতে চার দেয়াল ও একটি ছাদ থাকা বোঝায় না।
তিনি আরও বলেন, কোনো পরিবারের মাথার ওপর ছাদ থাকতে পারে কিন্তু বাড়িভাড়া দিতে গিয়ে যদি খাবার, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবার জন্য খুব সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে, তাহলে সেটিকে পর্যাপ্ত আবাসন বলা যায় না। একইভাবে কোনো বাড়ির ভাড়া সাশ্রয়ী হলেও সেটি যদি কর্মসংস্থান, স্কুল বা গণপরিবহন থেকে অনেক দূরে হয়, তাহলেও তা পর্যাপ্ত আবাসনের মানদণ্ড পূরণ করে না।
সবার জন্য নিরাপদ আবাসন
জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস বলেন, পর্যাপ্ত আবাসনে বিনিয়োগ এবং অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোর রূপান্তর দারিদ্র্য কমায়, বৈষম্য মোকাবিলা করে, জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ায় এবং শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
এ জন্য জাতীয় ও স্থানীয় সরকারগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ, শক্তিশালী অংশীদারত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্যের আরও কার্যকর ব্যবহারের আহ্বান জানান গুতেরেস।
জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বৃহৎ পরিসরে আবাসন খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থারও সংস্কার প্রয়োজন।
বিশ্ব আবাসন দিবসের বার্তার শেষদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আসুন, আবাসনকে একটি জনকল্যাণমূলক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করি এবং এমন একটি বিশ্ব গড়ে তুলি যেখানে প্রত্যেকের নিজের একটি ঘর থাকবে।
টিআই