তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল তাদের। বয়স তখন মাত্র দেড় মাস। কথা ছিল, নির্ধারিত সময় শেষে উপযুক্ত পরিবেশে নেওয়া হবে। কিন্তু সেই তিন সপ্তাহ আর শেষ হয়নি। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে কেটে গেছে প্রায় নয় বছর। এবার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানে গাজীপুর সাফারি পার্কে দুই লেপার্ডের জন্য তৈরি হচ্ছে আলাদা বেষ্টনী। এ প্রকল্পে ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০১৭ সালের নভেম্বরে যশোর থেকে উদ্ধার হওয়ার পর গাজীপুর সাফারি পার্কের কোয়ারেন্টিন শেডে নেওয়া হয়েছিল দুই লেপার্ডকে। বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন পরিবেশে আনা প্রাণীকে তিন সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে রাখার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের আর সেই ঘর থেকে বের করা হয়নি।
এরপর বয়স বেড়েছে, বদলেছে শরীরের গড়ন। শুধু বদলায়নি ঠিকানা। ছোট্ট সেই কোয়ারেন্টিন শেডই হয়ে উঠেছে তাদের দীর্ঘদিনের আবাস। যে বয়সে বন্য পরিবেশে গাছে ওঠা, ছুটে চলা ও শিকার ধরার মতো স্বাভাবিক আচরণ শেখার কথা, সেই সময়টুকু তারা কাটিয়েছে সীমিত পরিসরের মধ্যে। আলাদা বেষ্টনী না থাকায় দর্শনার্থীদের কাছ থেকেও অনেকটা আড়ালেই ছিল তারা।
তবে এবার পরিস্থিতি বদলানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান জানান, দুই লেপার্ডের জন্য ১৫০ বর্গমিটারের একটি আলাদা বেষ্টনী নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৪ সালে সাফারি পার্কের অত্যাবশ্যকীয় ব্যবস্থাপনা প্রকল্প চালু হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় লেপার্ডের জন্য আলাদা বেষ্টনী নির্মাণের বিষয়টি রাখা হয়েছিল। বর্তমানে বেষ্টনীটি কোথায় নির্মাণ করা হবে, তা নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। জায়গা চূড়ান্ত হওয়ার পর দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
যশোর থেকে শুরু
দুই লেপার্ডের বন্দিজীবনের শুরু গাজীপুরে নয়, যশোরে।
২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া এলাকায় একটি গাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে দুটি লেপার্ড ও দুটি সিংহশাবক উদ্ধার করা হয়। বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগে আটক করা হয় দুজনকে।
পরে চার শাবককেই গাজীপুর সাফারি পার্কে নিয়ে আসা হয়। নতুন পরিবেশে আনা প্রাণীদের নিয়ম অনুযায়ী কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। চার শাবককেই রাখা হয়েছিল কোয়ারেন্টিন শেডে। নির্ধারিত সময় ছিল তিন সপ্তাহ।
সিংহশাবক দুটির ক্ষেত্রে পরে পরিস্থিতি বদলায়। তাদের সাফারি পার্কে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু দুই লেপার্ডের আর কোয়ারেন্টিন শেড থেকে বের হওয়া হয়নি।
যে বয়সে বন শেখার কথা
উদ্ধারের সময় দুই লেপার্ডের বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস। তখনও তাদের স্বাভাবিক বন্য আচরণ গড়ে ওঠার সময়।
কেটে গেছে প্রায় নয় বছর।
এই দীর্ঘ সময়ে গাছের ডালে ওঠা, নিজের মতো করে বিচরণ করা কিংবা শিকার ধরার মতো স্বাভাবিক আচরণ বিকাশের সুযোগ কতটা পেয়েছে তারা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ আলাদা বেষ্টনী না থাকায় তাদের জীবন সীমিত থেকেছে কোয়ারেন্টিন শেডের পরিসরেই।
এখন সেই বাস্তবতা বদলানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেষ্টনীতে থাকবে যা
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৫০ বর্গমিটারের বেষ্টনীতে লেপার্ডের স্বাভাবিক আচরণের সুযোগ তৈরির ব্যবস্থা থাকবে। গাছে ওঠার জন্য থাকবে গাছপালা। সম্ভব হলে প্রাকৃতিক গাছ ব্যবহার করা হবে। তা সম্ভব না হলে তৈরি করা হবে কৃত্রিম গাছ।
এ ছাড়া বেষ্টনীতে থাকবে পানির ব্যবস্থা এবং রাত কাটানোর জন্য নাইট শেল্টার।
তবে বেষ্টনীটি ঠিক কোথায় নির্মাণ করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। জায়গা নির্ধারণের পরই সিদ্ধান্ত হবে দর্শনার্থীরা দুই লেপার্ডকে দেখার সুযোগ পাবেন কি না।
তিন সপ্তাহ থেকে নয় বছর
দেড় মাস বয়সে যে দুই লেপার্ডকে তিন সপ্তাহের জন্য কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হয়েছিল, তাদের জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটে গেছে সেই কোয়ারেন্টিন শেডে।
এবার তাদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নতুন বেষ্টনী।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দুই লেপার্ড কিছুটা হলেও স্বাভাবিক পরিবেশের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাবে। থাকবে গাছে ওঠার জায়গা, পানি, রাতের আশ্রয় এবং তুলনামূলক বড় পরিসরে চলাফেরার সুযোগ।
তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টিন যে প্রায় নয় বছরের অপেক্ষায় পরিণত হয়েছিল, ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার এই বেষ্টনী সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।
আরএস/এসএস