সেতুর ওপারে যেতে হলে প্রথমে মাটির ঢাল বেয়ে উঠতে হয়। ঢাল শেষ হওয়ার আগেই সামনে পড়ে একটি মই। সেই মই পেরিয়েই উঠতে হয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটিতে। নিচে সুতিয়া নদী, ওপরে আধুনিক সেতু-শুধু নেই সেতুতে ওঠার স্বাভাবিক পথ।
প্রতিদিন এই অস্বাভাবিক পথেই চলছে মানুষের যাতায়াত। কেউ মই বেয়ে উঠছেন, কেউ মাটির ঢাল ধরে এগোচ্ছেন। সঙ্গে শিক্ষার্থী থাকলে ভয়টা আরও বাড়ে। সামান্য বৃষ্টিতে মাটি পিচ্ছিল হয়ে গেলে এই পথ পরিণত হয় দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে।
গাজীপুরের শ্রীপুরের কাওরাইদ ও ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের মাঝামাঝি সুতিয়া নদীর ওপর নির্মিত প্রায় ৯ কোটি টাকার সেতুটির বাস্তব চিত্র এখন এমনই।
সেতুর কাজ শেষ। কিন্তু সংযোগ সড়ক নেই।
ফলে যে সেতু দুই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ সহজ করার কথা, সেটিই এখন অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে বিড়ম্বনার আরেক নাম।
২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল সুতিয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজ। ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে মূল সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্প অনুযায়ী কাজ শেষ হয় ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি।
প্রায় ১৫ ফুট উচ্চতার সেতুটি এখন দাঁড়িয়ে আছে সুতিয়া নদীর ওপর। দেখতে দৃষ্টিনন্দন, কাঠামোগতভাবে নির্মাণও শেষ। কিন্তু সেতুর দুই প্রান্তে মানুষের স্বাভাবিক ওঠানামার জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক না থাকায় এর পুরো সুবিধা মিলছে না।
স্থানীয়দের উদ্যোগেই সেতুর এক পাশে মাটি ফেলে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী ঢাল। কোথাও আবার ওঠার সুবিধার জন্য বসানো হয়েছে মই।
এই অস্থায়ী ব্যবস্থাই এখন মানুষের স্থায়ী ভরসা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে মাটি ও মই ব্যবহার করে সেতুতে ওঠা সম্ভব হলেও বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। মাটির খাড়া ঢাল পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। তখন শিক্ষার্থী, নারী, বয়স্ক মানুষ কিংবা ভারী মালামাল বহনকারীদের জন্য পারাপার আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে সেতুর বিকল্প হিসেবে রয়েছে পাশের রেলওয়ে সেতু। সেটিও সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচলের জন্য তৈরি নয়। তবু অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন ধরে সেটি ব্যবহার করছেন।
অর্থাৎ সামনে সেতু, কিন্তু নিরাপদ পথ নেই; আর বিকল্প পথে রয়েছে আরও বড় ঝুঁকি।
স্থানীয় বাসিন্দা মঞ্জুরুল করিমের কথায় উঠে আসে সমস্যাটির দৈনন্দিন চিত্র।
তিনি বলেন, সেতুর মূল কাজ শেষ হয়েছে। এখন মূল সমস্যা সংযোগ সড়ক নিয়ে। এলাকায় একটি সরকারি, একটি এমপিওভুক্ত ও একটি বেসরকারি স্কুল রয়েছে। এসব শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এ পথ ব্যবহার করেন। পাশের রেলব্রিজ দিয়ে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। আর বৃষ্টি হলে নতুন সেতুর মাটির ঢাল দিয়েও চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তার প্রত্যাশা, দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হলে সেতুটি প্রকৃত অর্থেই মানুষের কাজে আসবে।
আরেক বাসিন্দা মো. কায়সারের দাবি, সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য যে জায়গা প্রয়োজন, সেটি বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি। সেখানে কিছু মানুষ বাড়িঘর করে বসবাস করছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি যেন সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণের পথে স্থায়ী বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
শিক্ষার্থী নাসরিন বেগম বলেন, আগে সেতুতে ওঠার জায়গাটি আরও উঁচু ছিল। রডের মতো কিছু ধরে তারা কোনোভাবে সেতুতে উঠতেন। এখন সেখানে মাটি দেওয়া হয়েছে এবং একটি মই বসানো হয়েছে।
তার ভাষায়, বিকল্প হিসেবে রেলওয়ে সেতু ব্যবহার করতে হয়, কিন্তু সেটিও ঝুঁকিপূর্ণ। সংযোগ সড়কটি তৈরি হয়ে গেলে কলেজে যাতায়াত অনেক সহজ হবে।
নাসরিনের মতো অসংখ্য শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের যাতায়াতের সঙ্গে এখন সেতুটির অসম্পূর্ণ সংযোগ পথের বিষয়টি জড়িয়ে গেছে।
সেতুটির গুরুত্ব শুধু স্থানীয় মানুষের চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বলে জানিয়েছেন বাসিন্দা হান্নান শেখ।
তার ভাষ্য, সেতুটি ময়মনসিংহের গফরগাঁও ও গাজীপুরের শ্রীপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। গফরগাঁওয়ের ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে আটটি ইউনিয়নের মানুষ এ পথে চলাচল করেন। একই সঙ্গে আশপাশের এলাকার উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণের পরও সংযোগ সড়কের অভাবে সেটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে না পারাকে তিনি দুঃখজনক বলে মনে করেন।
কেন এমন হলো-জানতে চাইলে গাজীপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ এমদাদুল হক বলেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।
তিনি জানান, এটি অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার প্রকল্পের আওতাভুক্ত। এ ধরনের প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের জন্য অর্থের সংস্থান রাখা হয়নি। ফলে সারা দেশে এ প্রকল্পের আওতায় নেওয়া কোনো স্কিমেই জমি অধিগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি।
তবে এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন নির্বাহী প্রকৌশলী।
সুতিয়া নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেতুটি এখন দুই জেলার মানুষের কাছে শুধু একটি অবকাঠামো নয়, একটি অপেক্ষার নাম।
একদিকে প্রায় ৯ কোটি টাকার নির্মাণকাজ শেষ হওয়া সেতু। অন্যদিকে সেতুতে ওঠার জন্য মাটির ঢাল ও একটি মই। প্রতিদিন সেই অস্থায়ী পথ পেরিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে যেতে হচ্ছে নিজেদের গন্তব্যে।
সেতু তৈরির উদ্দেশ্য ছিল দুই পাড়কে কাছাকাছি আনা। কিন্তু সংযোগ সড়ক না থাকায় সেই সংযোগ এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
সুতিয়া নদীর ওপর সেতুটি তাই দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই-কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াতের পথটি এখনও যেন নদীর দুই পাড়ের মাঝখানেই কোথাও আটকে আছে।
এসএ