ভোরের আলো ফুটতেই বেলুয়া নদীর বুকজুড়ে শুরু হয় শত শত নৌকার আনাগোনা। কোনো নৌকায় শাকসবজি, কোনো নৌকায় ধান-চাল; আবার কোনো নৌকায় তরমুজ, আখ, নারিকেল কিংবা সবজির চারা। নৌকা থেকে নৌকায় চলে দরদাম, পণ্য ওঠানামা ও কেনাবেচা। কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর বুকই হয়ে ওঠে জমজমাট এক বাণিজ্য কেন্দ্র। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় এই ভাসমান বাজারে প্রতি হাটে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার কৃষিপণ্য কেনাবেচা হয়। তবে তরমুজের মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরে এ বাজারে মোট বেচাকেনার পরিমাণ প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা।
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন বেলুয়া নদীতে সপ্তাহে দুই দিন—শনিবার ও মঙ্গলবার—বসে ব্যতিক্রমী এ ভাসমান হাট। জলপথকেন্দ্রিক বাজার ও নৌকানির্ভর জীবনযাত্রার কারণে স্থানীয়রা একে ভালোবেসে ‘বাংলার ভেনিস’ বলেও ডেকে থাকেন। নাজিরপুরের অংশে বেলুয়া নদীর প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসা এ বাজার নাজিরপুর, নেছারাবাদ ও বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীদের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
নাজিরপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের এ বাজারে ভোর থেকেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পাইকাররা নৌকা নিয়ে জড়ো হতে থাকেন। তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই মূল কেনাবেচা শেষ হয়ে যায়। সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে অধিকাংশ নৌকা পণ্য নিয়ে ফিরে যেতে শুরু করে; এরপর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে নদীর বুক।
নাজিরপুরের কলারদোয়ানিয়া, মুগারঝোর, মনোহরপুর, পদ্মডুবি, বিলডুমুরিয়া, সোনাপুর, গাওখালী, চাঁদকাঠি, সাচিয়া, লড়া ও পেনাখালীসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরা নৌকায় করে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আসেন। একইভাবে নেছারাবাদের বলদিয়া, গগন, মলুহার, কাঁটাখালী, ইলুহার ও জনতা এবং বানারীপাড়ার বিশারকান্দি, উমারেরপাড়, উদয়কাঠী, কদমবাড়ি ও চৌমোহনাসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরাও এখানে নিয়মিত পণ্য বিক্রি করেন।
ভাসমান এ হাটে বরবটি, কুমড়া, পুঁইশাক, করলা, পটল, কাঁকরোল, কাঁচকলা, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, শালগম, কচু, চালকুমড়া, নারিকেল, কলা, শাপলা ও সবজির চারাসহ নানা কৃষিপণ্যের সমারোহ ঘটে। পাশাপাশি হাটের সুবিধার্থে নদীর বুকেই রয়েছে চা, পিঠা ও বিভিন্ন খাবারের ভাসমান দোকান।
এ বাজারের আরেকটি প্রধান বিশেষত্ব হলো ভাসমান কৃষির উপকরণের বেচাকেনা। শাকসবজি ও ফলমূলের পাশাপাশি এখানে বিক্রি হয় কচুরিপানা, তেঁপাপোনা, দুলালিলতা, ফেনা, শ্যাওলাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও আগাছা। এসব উপকরণ দিয়ে ধাপে বা ভাসমান বেড তৈরি করে শীতকালীন সবজি ও সবজির চারা উৎপাদন করেন স্থানীয় কৃষকেরা। ফলে কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ—পুরো প্রক্রিয়াটিই নদী ও নৌকাকেন্দ্রিক।
জলাবদ্ধ ও পানিতে ডুবে থাকা জমিতে ভাসমান ধাপ তৈরি করে সবজি ও চারা উৎপাদন করা এই অঞ্চলের শতবছরের পুরোনো এক কৃষিপদ্ধতি। পরবর্তীতে নৌপথে এসব পণ্য বৈঠাকাটা বাজারে আসে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এখানে এসে পণ্য কিনে আশপাশের উপজেলা বাজারে নিয়ে যান। স্থানীয়দের দাবি, এখানকার উৎপাদিত কৃষিপণ্যের একটি অংশ প্রক্রিয়াজাত হয়ে দেশের বাইরেও রপ্তানি হয়।
ব্যবসায়ী কালাম তালুকদার বলেন, “গ্রাম থেকে পণ্য কিনে এনে এখানে বিক্রি করি। বেশিরভাগ সময় কাঁকরোল বিক্রি করি। এই বাজারে বেচাকেনা ভালো হয়, দামও ভালো পাই। এ আয় দিয়েই সংসার চালাচ্ছি।”
আরেক ব্যবসায়ী আলী আহমেদ বলেন, শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরে বাজার শুরু হয়ে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে। কাঁচা সবজি, নারিকেল ও তরমুজ এ বাজারের প্রধান পণ্য। তরমুজের মৌসুমে এক থেকে দেড় কোটি টাকার মতো বেচাকেনা হয়। বর্তমানে স্বাভাবিক সময়েও প্রতিটি হাটে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
জলজ উদ্ভিদ বিক্রেতা ইব্রাহিম জানান, তিনি দুলালিলতা নিয়ে বাজারে আসেন। ভালো দিনে আট থেকে নয় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, আর বাজার খারাপ গেলে আয় হয় পাঁচ হাজার টাকার মতো। অন্যদিকে ক্রেতা মিনহাজুল জানান, ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের জন্য শ্যাওলা ও দুলালিলতা কিনতে তিনি নিয়মিত এ বাজারে আসেন।
ঐতিহ্যবাহী এ বাজারটির প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট সময় জানা না গেলেও স্থানীয়দের ধারণা, এর বয়স এক শতাব্দীর কম নয়। প্রায় চার দশক ধরে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রফিকুল বলেন, “১৯৭১ সালে আমার জন্ম। এর আগেও এই হাট ছিল। আমার ধারণা, হাটটির বয়স অন্তত ৭০ থেকে ৭৫ বছর হবে।” স্থানীয় কৃষক মো. আলামিনও জানান, বাবা-দাদার আমল থেকেই তারা এখানে এভাবে কৃষিপণ্য বেচাকেনা হতে দেখে আসছেন।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বৈঠাকাটা বাজারের রয়েছে বিশাল পর্যটন সম্ভাবনা। নদীর বুকজুড়ে শত শত নৌকা, কৃষিপণ্যের কেনাবেচা, নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা ও স্থানীয় সংস্কৃতি দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা এখানে আসেন। সম্প্রতি ভেলা বাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী লোকজ আয়োজনও হয়েছে এ বাজারকে ঘিরে।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, বৈঠাকাটা বাজারে নৌকার ওপর শাকসবজি, ফলমূল, সবজির চারা এবং চারা উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ বেচাকেনা হয়। শনিবার ও মঙ্গলবার খুব ভোরে বসা এ বাজারে দূর-দূরান্তের কৃষক ও পাইকাররা আসেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বছরে এ বাজারে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়ে থাকে।
নদী, নৌকা, কৃষি ও মানুষের জীবনজীবিকার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বৈঠাকাটা ভাসমান হাট তাই কেবল একটি কেনাবেচার স্থান নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের প্রদীপ্ত কৃষি অর্থনীতি, লোকজ সংস্কৃতি ও নদীকেন্দ্রিক জীবনের এক জীবন্ত চিত্র।
জাকির হোসেন ফরাজী/এসএ