ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে রাজধানী থেকে উত্তরের পথে এগোলেই একসময় চোখে পড়ে সবুজ শালবনের ভেতর গড়ে ওঠা একটি সরকারি পর্যটনকেন্দ্র। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রকৃতির কাছে যাওয়ার কথা ছিল এখানে। পরিবার নিয়ে অবকাশ, বন্ধুদের আড্ডা, করপোরেট আয়োজন কিংবা শিক্ষা সফর-সবকিছুরই সম্ভাবনা ছিল জায়গাটিতে।
কিন্তু প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি সেই সম্ভাবনার জায়গাটিই এখন দাঁড়িয়ে আছে ভিন্ন এক হিসাবের সামনে।
চার বছরে রিসোর্টটি থেকে আয় হয়েছে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বিপরীতে পরিচালনাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ আয় দিয়ে ব্যয়ের হিসাব মেলেনি; ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
প্রশ্ন উঠছে-ঢাকার এত কাছে, মহাসড়কের পাশে, শালবনের প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন একটি সরকারি পর্যটনকেন্দ্র থাকার পরও কেন পর্যটক টানছে না? সমস্যা কি অবকাঠামোতে, ব্যবস্থাপনায়, জনবলে, নাকি প্রচার-প্রচারণার ঘাটতিতে?
প্রকৃতির ঠিকানা, কিন্তু পর্যটকের অপেক্ষায়
রাজধানী থেকে দূরত্ব মাত্র ৩৬ কিলোমিটার। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ঘেঁষে বন বিভাগের প্রায় ৯ বিঘার বেশি জমিতে গড়ে উঠেছে সালনা পর্যটন রিসোর্ট অ্যান্ড পিকনিক স্পট।
প্রকল্পের পরিকল্পনা ছিল সহজ-রাজধানীর কাছেই এমন একটি জায়গা তৈরি করা, যেখানে মানুষ শহরের ব্যস্ততা থেকে বেরিয়ে সবুজের মধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে পারবেন।
সেই লক্ষ্যেই ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় নির্মাণকাজ। প্রায় সাড়ে তিন বছর পর ২০২২ সালের জুনে শেষ হয় কাজ। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
রিসোর্টে রয়েছে কটেজ, রেস্তোরাঁ, কনফারেন্স হল, পিকনিক শেডসহ বিভিন্ন স্থাপনা। চারপাশে গাছপালা ও শালবনের আবহও রয়েছে। অর্থাৎ পর্যটকের জন্য প্রয়োজনীয় একটি মৌলিক কাঠামো সেখানে তৈরি করা হয়েছে।
তবে স্থাপনা তৈরি হলেই তো পর্যটক আসে না। সেই জায়গাটিতেই যেন আটকে গেছে সালনার গল্প।
যে হিসাবটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে অবচয়সহ রিসোর্টটির পরিচালন ব্যয় ছিল ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। আয় হয়েছিল ২৩ লাখ টাকা। ফলে লোকসান দাঁড়ায় ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যয় বেড়ে হয় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আয় কিছুটা বাড়লেও তা ছিল ৫০ লাখ টাকা। ফলে ওই বছর ঘাটতি থাকে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় হয় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আয় হয় ৬৭ লাখ টাকা। লোকসান দাঁড়ায় ১ কোটি ৩ লাখ টাকা।
আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যয়ের অঙ্ক পৌঁছে যায় ১ কোটি ৯১ লাখ টাকায়। অথচ আয় কমে দাঁড়ায় ৪৮ লাখ টাকা। এক বছরেই ঘাটতি ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
অর্থাৎ চার অর্থবছরে অবচয়সহ মোট ব্যয় ৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং আয় ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ঘাটতি ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
হিসাবের খাতা তাই বলছে-পর্যটকের আনাগোনার চেয়ে রিসোর্টটির সঙ্গে বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে লোকসানের অঙ্ক।
অন্য হিসাবেও স্বস্তি নেই
অবচয়সহ সামগ্রিক হিসাবের বাইরে আবাসিক, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাতের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও একই চিত্র দেখা যায়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে এসব খাতে আয় হয় ২২ লাখ ৪২ হাজার ৩৯৬ টাকা। ব্যয় ছিল ৪৬ লাখ ৮৭ হাজার ৮৭৪ টাকা। লোকসান ২৪ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭৮ টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় দাঁড়ায় ৪৬ লাখ ৭১ হাজার ৬৮৩ টাকা। ব্যয় হয় ৮১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৯৬ টাকা। ঘাটতি ৩৫ লাখ ১৩ হাজার ২১৩ টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় হয় ৬৬ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬১ টাকা। ব্যয় ৮৬ লাখ ১১ হাজার ৩২৫ টাকা। লোকসান ১৯ লাখ ৬১ হাজার ৩৬৪ টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় কমে হয় ৪৮ লাখ ৩ হাজার ৯০ টাকা। ব্যয় দাঁড়ায় ৭৪ লাখ ৭৬ হাজার ২৩০ টাকা। লোকসান ২৬ লাখ ৭৩ হাজার ১৪০ টাকা।
চার বছরে স্ট্যাবিলিসমেন্ট কস্ট বাদ দিয়ে আবাসিক, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাত থেকে মোট আয় ১ কোটি ৮৩ লাখ ৬৭ হাজার ১৩০ টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৯ লাখ ৬০ হাজার ৩২৫ টাকা। এ হিসাবেও ঘাটতি ১ কোটি ৫ লাখ ৯৩ হাজার ১৯৫ টাকা।
সুন্দর জায়গা, কিন্তু জানেই না মানুষ?
সালনায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের কথাতেও উঠে এসেছে একই ধরনের প্রশ্ন।
তাদের মতে, ঢাকার এত কাছে এমন প্রাকৃতিক পরিবেশের জায়গা থাকার পরও রিসোর্টটি নিয়ে তেমন প্রচার-প্রচারণা চোখে পড়ে না। শুধু গাছপালা কিংবা সুন্দর পরিবেশ দিয়ে পর্যটক ধরে রাখা সম্ভব নয়; বিনোদনের সুযোগ, সেবার মান, নতুনত্ব এবং নিয়মিত প্রচারও প্রয়োজন।
অর্থাৎ জায়গা আছে, অবকাঠামো আছে-কিন্তু পর্যটকের কাছে সেটিকে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
জনবল সংকটেও আটকে যাচ্ছে আয়োজন
বাংলাদেশ পর্যটক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান বলেন, সালনা পর্যটন রিসোর্ট অ্যান্ড পিকনিক স্পটে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, পার্টি, আনন্দ ভ্রমণ, শিক্ষা সফরসহ বিভিন্ন আয়োজনের জন্য বুকিং করতে গেলে অনেক সময় কর্তৃপক্ষ জনবল সংকটের কথা জানায়। ফলে ইভেন্ট আয়োজন করা সম্ভব হয় না এবং পর্যটকরাও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
তার মতে, রিসোর্টে সুইমিংপুল নেই। ভেতরে অবাধে মোটরসাইকেল প্রবেশ এবং বহিরাগতদের আনাগোনার বিষয়ও রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি সালনার পর্যটন স্পটকে আরও সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন।
কর্তৃপক্ষও মানছে, এখনও অনেক কিছু বাকি
চার বছরের ধারাবাহিক লোকসানের পর রিসোর্টটিকে আরও আকর্ষণীয় করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপক সাবির উদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, প্রকৃতির কোলে পর্যটনকেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে। তবে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো আরও অনেক কিছু সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টে খেলার মাঠ নেই, কিডস জোন নেই, সুইমিংপুলও নেই। এসব সুবিধা যুক্ত করা গেলে পরিবার নিয়ে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়তে পারে।
অর্থাৎ চার বছর পর এসে কর্তৃপক্ষের উপলব্ধিও অনেকটা একই জায়গায়-শুধু অবকাঠামো বানিয়ে পর্যটনকেন্দ্রকে সফল করা যায় না; দর্শনার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে নতুনত্ব ও বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতে হয়।
লোকসানের ব্যাখ্যায় ‘অবচয়’
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মো. মইনুল ইসলাম বলেন, সালনা পর্যটন রিসোর্ট অ্যান্ড পিকনিক স্পটে নতুন কিছু সুবিধা যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। এ নিয়ে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
তবে রিসোর্টের লোকসানের হিসাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার প্রতিষ্ঠানটিতে যে অর্থ বিনিয়োগ করেছে, সেটিকে স্ট্যাবিলিসমেন্ট কস্ট হিসেবে বিবেচনা করে পাঁচ বছরের মধ্যে ওই অর্থ তুলে নেওয়ার হিসাব করা হয়। পাঁচ বছর ভাগ করে হিসাব করায় অবচয় যুক্ত হয়। ফলে কোনো মাসে আয় হোক বা না হোক, ওই অবচয় হিসাব থেকে বাদ দিতে হয়।
এ কারণে প্রতিষ্ঠান পরিচালন পর্যায়ে লাভে থাকলেও নিট হিসাবে লাভ দেখা যায় না এবং লোকসান দেখানো হয় বলে জানান তিনি।
প্রশ্নটা শুধু লোকসানের নয়
সালনা রিসোর্টের হিসাবকে শুধু আয়-ব্যয়ের খাতা হিসেবে দেখলে গল্পের একটি অংশই দেখা হয়।
প্রায় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণের পর চার বছরে পরিচালন ব্যয় হয়েছে আরও ৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সেই সময়ে আয় হয়েছে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
এখানে মূল প্রশ্ন তাই শুধু ‘কত টাকা লোকসান হলো’-তা নয়। প্রশ্ন হলো, যে অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেটিকে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কেন প্রত্যাশিত পর্যটক তৈরি করা যাচ্ছে না।
একটি সরকারি পর্যটনকেন্দ্রের সাফল্য শুধু ভবন, কটেজ কিংবা শেডের সংখ্যায় মাপা যায় না। সেখানে মানুষের আসা, থাকা, সময় কাটানো, আবার ফিরে আসার আগ্রহ তৈরি হওয়া-এসবও সাফল্যের অংশ।
সামনে এখন দুই পথ
স্থানীয়দের মতে, সালনা রিসোর্টকে কেবল লোকসানি সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ প্রকল্পে একবার প্রায় ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এরপর পরিচালনায়ও প্রতি বছর অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
এখন প্রয়োজন নতুন করে ভাবা-কীভাবে এই জায়গাকে মানুষের কাছে পরিচিত করা যায়, কীভাবে সেবার মান বাড়ানো যায়, কীভাবে পরিবার ও শিশুদের জন্য বিনোদনের সুযোগ তৈরি করা যায় এবং কীভাবে নিয়মিত আয়োজন ও প্রচারের মাধ্যমে দর্শনার্থী বাড়ানো যায়।
নইলে শালবনের সবুজের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই সরকারি রিসোর্টটির গল্প হয়তো এমনই থাকবে-প্রকৃতি আছে, অবকাঠামো আছে, বিনিয়োগ আছে; শুধু নেই প্রত্যাশিত পর্যটকের সেই ভিড়।
আর সেই শূন্যতার সঙ্গে বছর শেষে যোগ হতে থাকবে নতুন লোকসানের অঙ্ক।
রফিক সরকার/এসএ