ইরান যুদ্ধের অভিঘাতে তেলের বাজারে অস্থিরতা, বাড়ছে পরিবহন ও জীবনযাত্রার ব্যয়
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের অভিঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সিরিয়া থেকে গুয়াতেমালা, পর্তুগাল থেকে ফ্রান্স ও ফিলিপাইন । জ্বালানির বাড়তি দামের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন শ্রমিক, ব্যবসায়ী, জেলে, পরিবহনকর্মী ও সাধারণ মানুষ।
গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা, ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তেলের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে তেল উৎপাদন ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি সরবরাহ ভবিষ্যতে আরও সংকুচিত হতে পারে। এমন প্রত্যাশাও বাজারে দাম বাড়াচ্ছে।
তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে জ্বালানি ও পরিবহন খাতে। পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ায় বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সিরিয়ায় তীব্র বিক্ষোভ
জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে সিরিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। সরকার ডিজেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৭৫ সিরীয় পাউন্ড নির্ধারণ করে। একই সঙ্গে পেট্রোল ও গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়।
এর প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন সড়কে টায়ারসহ বিভিন্ন সামগ্রীতে আগুন দেন, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ করেন এবং তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল আটকে দেন। আলেপ্পোসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও সরকারি কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিও ওঠে।
তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিই সিরিয়ার মানুষের একমাত্র ক্ষোভের কারণ নয়। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, কম আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি জনঅসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে।
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংগ্রহের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়াতে হয়েছে। দেশটির বড় একটি অংশের জ্বালানি আমদানিনির্ভর। এর ওপর বানিয়াস রিফাইনারি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকায় সরবরাহের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
গুয়াতেমালায় সড়ক অবরোধ
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে গুয়াতেমালায় বিক্ষোভকারীরা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে সরকারের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না। ট্রাক, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের ব্যয় বাড়ায় ব্যবসা ও সরবরাহব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
পর্তুগালে শ্রমিক-ব্যবসায়ীদের মিছিল
পর্তুগালেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করেছেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে মিছিল করে বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপের কথা তুলে ধরেন।
জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহননির্ভর ব্যবসা ও সেবাখাতের পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ ধীরে ধীরে অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
ফ্রান্সে জেলেদের ডিপো অবরোধ
ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় ফস-সুর-মের এলাকায় প্রায় ৫০ জন জেলে একটি বড় জ্বালানি ডিপো অবরোধ করেন। তাদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম।
কয়েক ঘণ্টা অবরোধ চলার পর পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়।
স্থানীয় মেয়র ফিলিপ মরিজো সরকারের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়া, আয় কমে যাওয়া ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা স্থানীয় মৎস্যশিল্পকে চাপে ফেলেছে।
ফিলিপাইনে পরিবহন খাতে চাপ
ফিলিপাইনেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস ও পরিবহনচালক, মোটরচালক, ছোট ব্যবসায়ী এবং সাধারণ যাত্রীরা বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের মুখে পড়ছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার প্রতি দেশটির জ্বালানি বাজার সংবেদনশীল হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি নীতি ও কর কমানোর মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়ছে ব্যয়ের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি শীত মৌসুমে হিটিং অয়েলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে যেসব মার্কিন পরিবার ঘর গরম রাখতে হিটিং অয়েলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের শীতকালীন ব্যয়ও বাড়তে পারে।
হরমুজ ও বাব এল মান্দেব ঘিরে উদ্বেগ
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথ। হরমুজ প্রণালী ও বাব এল মান্দেব নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ বড় ভূমিকা রাখছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। অন্যদিকে ইয়েমেনের সংঘাত বাব এল মান্দেব প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
এর সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা, তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তাঝুঁকি এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হামলার খবর যুক্ত হয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।
১৬ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১০৮ ডলার ব্যারেলে উঠেছিল। একই সময়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরে তেল লোডিং বন্ধ থাকা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার খবরও বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাতের অর্থনৈতিক অভিঘাত এখন আর ওই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়ছে। আর সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
এফএস