টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বহুরিয়া ইউনিয়নের বহুরিয়া চতলবাইদ গ্রামের আবুল হাশেম। বয়স এখন ৭০ বছর। জীবনের ৫৭টি বছর কেটে গেছে ঘোড়ার সঙ্গে। শৈশবে বাবার ঘোড়া পালনের শখ দেখে যে ভালোবাসার জন্ম, বয়সের ভারেও তা মুছে যায়নি। বরং ঘোড়াই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের আনন্দ, প্রশান্তি ও পরিচয়ের অন্যতম অংশ।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারান আবুল হাশেম। তাঁর বাবা মোহাম্মদ বশির উদ্দিন ছিলেন একজন জনপ্রতিনিধি। পাশাপাশি শখ করে একটি ঘোড়া পালন করতেন তিনি। বাবার সেই ঘোড়ার প্রতি ভালোবাসা ছোট্ট আবুল হাশেমের মনেও তৈরি করে আলাদা এক টান। বাবার মৃত্যুর পরও সেই স্মৃতি ধরে রাখেন তিনি। শৈশবের সেই শখকে বুকে ধারণ করে শুরু করেন ঘোড়া পালন।
সেই শুরু। এরপর দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় ৫৭ বছর। জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সবকিছুর সঙ্গী হয়েছে ঘোড়া। বর্তমানে তাঁর বাড়িতে রয়েছে ১২টি ঘোড়া। এর মধ্যে ১১টি ভারতীয় প্রজাতির এবং একটি দেশি প্রজাতির। চারটি ঘোড়া বর্তমানে বাচ্চা প্রসবের অপেক্ষায় রয়েছে। এর আগে তাঁর খামারে আরও পাঁচটি বাচ্চা জন্ম নিয়েছে।
ঘোড়াগুলো শুধু পশু নয়, আবুল হাশেমের কাছে তারা পরিবারের সদস্যের মতো। ছোটবেলা থেকেই নিজের হাতে সন্তানস্নেহে ঘোড়াগুলোকে লালন-পালন করে আসছেন তিনি। ঘোড়ার যত্নে কোনো ধরনের কমতি না রাখতে মাসিক সম্মানির ভিত্তিতে দুজন কর্মীও রেখেছেন। তাঁরা নিয়মিত ঘোড়াগুলোর খাবার, পরিচর্যা ও দেখভাল করেন।
ঘোড়ার খাবারের তালিকাতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। প্রতিটি ঘোড়ার জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা ব্যয় হয়। ঘাস, ধানের কুঁড়া, গমের ভুসি, ছোলা-বুটসহ বিভিন্ন খাবার দেওয়া হয় তাদের।
শখের ঘোড়াগুলোর নামও রেখেছেন নিজের পছন্দমতো। নিউ সূর্য, মায়ের দোয়া, পাওয়ার হর্স, নোখরা ও মারোয়ারী। এমন নানা নামে ডাকেন তিনি। তাঁর খামারের সাদা ও বিভিন্ন রঙের ঘোড়াগুলোও বেশ নজরকাড়া। এসব ঘোড়া দেখতে প্রতিদিনই তাঁর বাড়িতে আসেন স্থানীয় মানুষসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম ও দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরা। কেউ আসেন শুধুই ঘোড়া দেখতে, আবার কেউ আসেন ঘোড়া কিনতে।
ঘোড়া পালনকে শুধু শখ হিসেবে ধরে রাখেননি আবুল হাশেম। ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতাও তাঁর জীবনের অন্যতম আকর্ষণ। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।
কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, মনোহরদী, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন তিনি।
এসব প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন নগদ অর্থ, টেলিভিশন, ফ্রিজ, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেলসহ নানা পুরস্কার। ঘোড়া পালন ও বিক্রি করেও আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন তিনি। শুধু গত বছরই সাতটি ঘোড়া বিক্রি করেছেন।
আবুল হাশেমের ঘোড়া পালনের প্রতি ভালোবাসা এখন অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করছে। স্থানীয় বাসিন্দা মকবুল হোসাইন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি আবুল হাশেমকে ঘোড়া পালন করতে দেখে আসছেন।
মকবুল হোসাইন বলেন, ‘আবুল চাচার ঘোড়া পালনের প্রতি আগ্রহ দেখে এলাকার অনেক মানুষ ও তরুণ-যুবকরাও ঘোড়া পালনে আগ্রহী হয়েছেন। তিনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আবুল চাচার ঘোড়া পালন দেখে আমারও মনে-প্রাণে ঘোড়া পালনের ইচ্ছা জেগেছে। ভবিষ্যতে সময়-সুযোগ পেলে আমিও ঘোড়া পালন করব।’
নিজের জীবনের সঙ্গে ঘোড়ার সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে আবুল হাশেম বলেন, ‘সেই ছোটবেলা থেকেই আমি ঘোড়া লালন-পালন করে আসছি। ঘোড়া লালন-পালন করে আমি মানসিক প্রশান্তি পাই।’
ঘোড়দৌড়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে টিভি, ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, নগদ অর্থসহ বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছি। ঘোড়াগুলো আমার জীবনের সম্মান বৃদ্ধি করেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন মানুষের কাছে আমার পরিচিতিও বাড়িয়েছে।’
ঘোড়া বিক্রি করেও আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মহান রাব্বুল আলামিন যতদিন আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন, ততদিন ঘোড়া লালন-পালনের মধ্য দিয়েই জীবনের শেষ সময়টুকু অতিবাহিত করতে চাই। আপনারা সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’
সখীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম শওকত আলী মাস্টার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই শখের বসে ঘোড়া লালন-পালন ও ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আবুল হাশেম অসংখ্য পুরস্কার জিতেছেন। মানুষের কাছেও তিনি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘোড়া বিক্রি করেও তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। তাঁর এই শখ শুধু তাঁকে আনন্দই দেয়নি, এলাকায়ও তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। তাঁর জন্য আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে দোয়া ও শুভকামনা রইল।’
বয়স ৭০ ছুঁয়েছে। শরীর আগের মতো সায় দেয় না। তবুও ঘোড়ার কাছে গেলেই যেন বয়সের ভার ভুলে যান আবুল হাশেম। তাঁর কাছে ঘোড়া শুধু শখ নয়। এ এক দীর্ঘ জীবনের গল্প, ভালোবাসার বন্ধন এবং নিজের পরিচয়ের অংশ।
তাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঘোড়ার সঙ্গেই থাকতে চান এই প্রবীণ অশ্বপালক। শৈশবে বাবার হাত ধরে যে শখের শুরু হয়েছিল, জীবনের শেষ প্রান্তেও সেই শখটিই যেন তাঁর সবচেয়ে আপন সঙ্গী হয়ে আছে।
সিরাজুস সালেকীন /এফএস