ভারতের উড়িষ্যার বঙ্গোপসাগর উপকূলে পণ্যবাহী জাহাজডুবির ঘটনায় নিখোঁজ সাতক্ষীরার মেরিন প্রকৌশলী আব্দুল্যাহ আল মামুনের (৩৫) অপেক্ষায় দিন কাটছে তার পরিবারের। তবে সমুদ্রের এই ট্র্যাজেডির গভীরতা এখনো বুঝতে পারেনি তার দুই শিশুসন্তান পাঁচ বছরের মারিফুল জান্নাত ও তিন বছরের মোয়াজ আব্দুল্লাহ। মোবাইল বেজে উঠলেই বাবার ভিডিও কলের আশায় তারা ছুটে যাচ্ছে স্ক্রিনের দিকে।
সাতক্ষীরা পৌরসভার আমতলা এলাকার ডা. আব্দুর রহিমের ছেলে আব্দুল্যাহ আল মামুন পানামার পতাকাবাহী ‘এমভি ওশান উইনার’ জাহাজে কর্মরত ছিলেন। ভারতের উপকূলে বঙ্গোপসাগরে যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়ে জাহাজটি ডুবে যাওয়ার পর থেকেই তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত বুধবার সর্বশেষ স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মামুন। শনিবার দুপুরে অন্য একটি সূত্রে জাহাজডুবির খবর পরিবারের কাছে পৌঁছায়। এরপর থেকেই বাড়িতে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। সবার চোখে অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা।
মামুনের দুই সন্তান এখনো বাবার ফোনের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। মোবাইল বেজে উঠলেই তারা মনে করছে, বাবা ফোন করেছেন। মারিফুল মাঝেমধ্যে মাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘মা, বাবা ফোন দিচ্ছে না কেন?’ সন্তানের এমন প্রশ্নে কোনো উত্তর দিতে পারছেন না মামুনের স্ত্রী।
নিখোঁজ মামুনের বাবা ডা. আব্দুর রহিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলে সমুদ্রে থাকলেও ফোনের মাধ্যমে আমাদের যোগাযোগ থাকত। জাহাজটি ডুবে যাওয়ার এত সময় পার হলেও ছেলেটা বেঁচে আছে কি না, সে খবরটুকু পাচ্ছি না। সরকারের কাছে আকুল আবেদন, যেন দ্রুত আমার ছেলেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়।’
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ্ কাউসার আজিজ জানান, ঘটনাটি জানার পরই নিখোঁজ ইঞ্জিনিয়ারের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের উদ্ধারকারী দল ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সার্বিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামুনের তথ্য পরিবারকে জানানোর সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত আছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল্যাহ আল মামুনের ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এটিই প্রথম কন্ট্রাক্ট ছিল। পানামার পতাকাবাহী চীনা জাহাজ মালিকের বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজটিতে ১ হাজার ৭০০ টন লোহার আকরিক বহন করা হচ্ছিল। একপর্যায়ে কার্গো শিপটি একদিকে কাত হতে শুরু করে। এরপর মাত্র আট মিনিটের মধ্যে জাহাজটি ডুবে যায়।
ঘটনার সময় নাবিকরা লাইফবোট নামাতে পারেননি এবং লাইফ জ্যাকেটও নিতে পারেননি। ২৮ বছরের পুরোনো ওই জাহাজে মোট ২৪ জন ক্রু ছিলেন। তাদের মধ্যে ২০ জন চীনা, তিনজন বার্মিজ এবং একজন বাংলাদেশের সাতক্ষীরা শহরের বাসিন্দা আব্দুল্যাহ আল মামুন।
শনিবার বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে ভারতীয় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর যৌথ উদ্ধার অভিযানে মাত্র দুইজন চীনা ক্রুকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়। তবে বাকি ২২ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে ততই শঙ্কা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে স্বজনদের উৎকণ্ঠা ও হতাশা।
এমজেডআর/আরএন